লালমনিরহাটে গুজব ছড়িয়ে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন গ্রেফতার-৩  

 
লালমনিরহাট অফিস \ লালমনিরহাটে গুজব ছড়িয়ে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ নির্মম ঘটনায় থানা পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতার এরাতে অনেকে এলাকা ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়।
গত ২৯ অক্টোবর সকালে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টি এম মমিনকে  প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্তটিম  গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক আবু জাফর। এই কমিটি ৩ দিনের মধ্যে তদন্ত রির্পোট দাখিল করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে। পুলিশ ও প্রতক্ষ্যদর্শীরা  জানান, রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রীপাড়া এলাকার আব্দুল ওয়াজেদ মিয়ার পুত্র ও রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক গ্রন্থাগারিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র শহিদুন্নবী জুয়েল (৫২) গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সুলতান যোবাইয়ের আব্দার নামে একজন সঙ্গীসহ বুড়িমারীতে বেড়াতে আসেন। বিকেলে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করেন তারা। নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার তার পায়ের ওপর পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও সুলতান যোবাইয়েরকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখে। খবর পেয়ে পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুন্নাহার, পাটগ্রাম থানার ওসি বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত হন। সন্ধ্যায় পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামের কতিপয় ব্যক্তি গুজব ছড়িয়ে দেয় যে কোরআন অবমাননার দায়ে দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙ্গে প্রশাসনের কাছ থেকে জুয়েলকে ছিনিয়ে মাঠের মধ্যে নিয়ে গলায় দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে ২শ মিটার দূরে নিয়ে প্রশাসনের সামনেই প্রকাশ্যে রাস্তার উপর ফেলে পিটিয়ে হত্যা করে ও আগুন ধরিয়ে পুরিয়ে দেয়া হয়। এসময় পুলিশ তার সঙ্গী যোবাইয়ের সুলতানকে নিয়ে কৌশলে ইউপি কার্যালয়ের দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে একটি ব্যাংকে আশ্রয় নেয় এবং গুরুতর আহত অবস্থায় জনতার কাছ থেকে রক্ষা করে হাসপাতালে প্রেরন করে। সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাটগ্রাম ও হাতীবান্ধা থানা পুলিশ, বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দফায় দফায় চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। একই সময় উসৃংখল জনতার ছোড়া ইট পাথরের আঘাতে পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন্ত কুমার মোহন্তসহ ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৭ রাউন্ড ফাঁকাগুলি ছোড়ে পুলিশ। রাত সাড়ে ১০টার দিকে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর ও পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি র‍্যাবের সদস্যরা টহল অব্যাহত রেখেছেন। এদিকে ঘটনাটি তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট টি এম এ মমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যগন হলেন, পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুন্নাহার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম। উক্ত কমিটিকে রোববারের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য  জেলা প্রশাসক নির্দেশ দিয়েছেন। অপরদিকে র‍্যাবের পক্ষ থেকেও ছায়া তদন্ত করা হচ্ছে বলে একটি বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে। পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন্ত কুমার মোহন্ত বলেন, নিহত জুয়েলের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং পুলিশের ওপর হামলা ও ইউনিয়ন পরিষদ ভাঙচুরের দায়ে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পুলিশ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবু জাফর সাংবাদিকদের বলেন, এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনা তদন্তে ৩ দিনের সময় দিয়ে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খোজ নিয়ে জানা গেছে, নিহত জুয়েল একজন ধর্মভিরু ও পরহেজগার ব্যক্তি ছিলেন এবং ১৯৯৪ ব্যাচের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। নিহত জুয়েলের পরিবার জানায়, চাকুরী না থাকাসহ নানা কারণে জুয়েল গত কয়েকদিন ধরে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিলেন তবে বদ্ধউন্মাদ ছিলেন না তিনি। তারা আরো জানান, ঘটনার দিন গত বৃহস্পতিবার সুলতান জোবায়ের আব্বাস নামে একজন দলিল লেখককে সঙ্গে নিয়ে একটি মোটরসাইকেল যোগে জুয়েল পাটগ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ভারতীয় সীমান্ত এলাকার বুড়িমারী স্থলবন্দর লাগোয়া বাজারে ওই মসজিদটিতে আসরের নামাজ আদায় করেন। এব্যাপারে পাটগ্রাম থানার ওসি বলেন, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা প্রকাশ্যেই ঘটিয়েছে। তাদের সকলের ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ পুলিশের সংগ্রহে আছে। ইন্ধন ও উস্কানিদাতা সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
 
 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *