Laghata Pic- 1

ইশরাত জাহান চৌধুরী, মৌলভীবাজার ::
মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষারে কেওলার হাওরের লাঘাটা নদীতে শ্যালো মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে ইউপি চেয়ারম্যানের ইন্ধনে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল বালু উত্তোলন করার অভিযোগ উঠেছে। উচ্চ আদালতে মৌলভীবাজারের নদী ছড়া থেকে বালু উত্তোলনে বিধি-নিষেধ ও সকল প্রকার যান্ত্রিক মেশিন বন্ধ থাকার কথা থাকলেও এগুলো কোথাও মানা হচ্ছে না। ইজারা ছাড়াই নদী থেকে বালু উত্তোলন করে ঠিকাদারদের সড়ক উন্নয় কাজে ব্যবহার করলেও এক দিকে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে মাটি ও বালি ব্যবস্থপনা আইন অমান্য করে ধ্বংস করা হচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময়ী সম্পদ। গতকাল বুধবার (২৪ আগষ্ট) সরেজমিনে পতনউষার ইউনিয়নের কেওলার হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লাঘাটা নদীতে বড় শ্যালো মেশিন স্থাপন করে পাইপ লাইন দিয়ে বালু উত্তোলন করে পাশ্ববর্তী খেলার মাঠে স্তুপ করা হচ্ছে। বালু উত্তোলনে কর্তব্যরত শ্রমিকরা বলেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তৌফিক আহমদ বাবু, ইউনিয়ন যুবলীগ সম্পাদক আবুল বশর জিল্লুল বালু উত্তোলন করছেন। মঙ্গলবার থেকে বালু উত্তোলনের কথা শ্রমিকরা জানালেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসীরা জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এখান থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ ট্রাক পরিমাণ বালু পরিবহন করে বিভিন্ন ঠিকাদারের উন্নয়নমূলক কাজে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা আর্থিকভাবে লাভবান হলেও সরকার হারাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে রাজস্ব এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। বালু উত্তোলনের সাথে জড়িতরা জানান, কমলগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে পরামর্শ করে তার মতামতের ভিত্তিতে লাঘাটা নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কাজের স্থানে সরবরাহ ছাড়াও উপজেলা চেয়ারম্যানের ঠিকাদারী কাজ সড়ক উন্নয়ন কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে। লাঘাটা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে পতনউষার ইউপি চেয়ারম্যান তওফিক আহমদ বাবু বলেন, তিনি বালু উত্তোলনের সাথে কোনভাবে যুক্ত নন। তবে পতনউষার উচ্চ বিদ্যালয়ের কিছু উন্নয়ন কাজের জন্য গ্রামবাসীদের কারা যেন বালু উত্তোলন করছেন। সেটি বন্ধ রাখার জন্য তিনি বলেছেন। ইউনিয়ন যুবলীগ সম্পাদক আবুল বশর বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। তার ভাবমূর্তি নষ্ট করতে অহেতুক বালু শ্রমিকরা তার নাম বলেছে। কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুর রহমান বলেন, লাঘাটা নদীর বালু মহাল ইজারা হয়নি। তবে বালুর অভাবে পতনউষার ইউনিয়নের একটি রাস্তার উন্নয়ন কাজ ব্যহত হচ্ছিল বলে আবুল বশরদের মাধ্যমে লাঘাটা নদী থেকে কয়েক ট্রাক বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে মাত্র। কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক বলেন বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে তহশিলদারকে পাঠিয়ে তদন্তক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন। পতনউষার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার ইভং হাল বলেন, লাঘাটা নদীর কোন ঘাটই বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেওয়া হয়নি। নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি সরেজমিন তদন্ত করে শ্যালো মেশিন দিয়ে ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সত্যতা পেয়েছেন। উপজেলা চেয়ারম্যানকে অবহিত করে তাঁর পরামর্শে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে ইউপি চেয়ারম্যান তাকে জানিয়েছেন বলে তহশিলদার জানান। পরে পতনউষার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী তওফিক আহমকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করার জন্যও তিনি জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০১৩ সনের ১৮ জুন তারিখে প্রজ্ঞাপন দ্বারা মৌলভীবাজার জেলার অন্তর্গত ৫১টি পাহাড়ি ছড়া সিলিকাবালু সম্পৃক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ১৯ টি-কে অযান্ত্রিক পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) গত ৮ মার্চ জনস্বার্থে রীট পিটিশন (রীট পিটিশননং ২৯৪৮/২০১৬) দায়ের করে। শুনানি শেষে ২১ মার্চ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ১৯টি বালুমহালকে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (ইআইএ) ও পরিবেশগত ছাড়পত্র (ইসিসি) ছাড়া পরবর্তী ইজারা প্রদানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন। সেই সাথে ইজারাভুক্ত ছড়াসমূহ থেকে সকল প্রকার ড্রিল, ড্রেজার, বোমা মেশিন এবং বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত যান্ত্রিক মেশিনসমূহ অবিলম্বে জব্দ করার জন্য আদালত নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের এই নির্দেশনার পরও বোমা মেশিনে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়নি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।