ধান-আলুতে লোকসান তামাক চাষে কৃষক

তাজিদুল ইসলাম লাল,রংপুর বিভাগীয় প্রতিনিধিঃ
খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য সুখ্যাত উত্তরাঞ্চল এখন তামাক চাষের ঘাঁটি। বছরের পর বছর ধান-আলুসহ দেশি ফসলে বিপুল লোকসানের মুখে রংপুরের অনেক কৃষকই সম্প্রতি তামাক চাষে ঝুঁকতে শুরু করেছেন। এর মধ্যে তামাক কোম্পানিগুলোর বিনামূল্যে বীজ, কীটনাশক, সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও ক্রয়ের নিশ্চয়তাসহ নানাবিধ লোভনীয় সুবিধার অফার তাদের ক্ষতিকর এ ফসল চাষে আরও উদ্বুদ্ধ করছে। এর ফলে জেলায় তামাক চাষের সঙ্গে বাড়াচ্ছে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ক্যানসার, পেট, বুক ও ঘাড় ব্যথার মতো নানা রোগ। অনেক নারী শ্রমিক আক্রান্ত হচ্ছেন প্রজনন স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যায়। আর হুমকির মুখে পড়ছে অন্যান্য ফসলের চাষ।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার গ্রামের পর গ্রামের হাজার হাজার কৃষক তামাক চাষ করছেন। গ্রামবাসীর ভাষ্য, গ্রামের কিছু মানুষকে অঘোষিত এজেন্ট হিসেবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে কোম্পানিগুলো চাষিদের দিয়ে আবাদ করিয়ে নিচ্ছে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তামাক।

শুধু গঙ্গাচড়া নয়, হারাগাছ, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, কাউনিয়াসহ পুরো রংপুর জেলায় বিস্তার লাভ করেছে তামাক চাষ। প্রতিবেশী জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতেও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এই বিষ ফসলের চাষ।

অভিযোগ আছে, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, জাপান টোব্যাকো, আকিজ টোব্যাকো ও আবুল খায়ের টোব্যাকো নিজেদের স্বার্থেই তামাক চাষের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছে।

কৃষকরা বলছেন, তামাক চাষে খরচ ও পরিশ্রম কম হয় বলেই ক্ষতিকর জেনেও তারা সেটি চাষ করছেন। যোবেদা বেওয়া (৭০) নামে এক তামাকচাষি জানান, স্বামী মারা গেছে অনেক দিন আগে। তিনি নদীভাঙনের কবলে পড়ে বর্তমানে মহিপুর-কাকিনা রোডের তিস্তা শেখ হাসিনা সেতুর উত্তরপ্রান্তের ডানপাশে ছেলে, বউ ও নাতি-নাতনিকে নিয়ে বসবাস করছেন। তাদের নির্ধারিত আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। ছেলে হাসান তামাকের সময় জমি লীজ নিয়ে তামাক চাষ করে। সেই তামাক শুকিয়ে সংরক্ষণ ও পরে বিক্রি করে তাদের সংসার চলে।

গান্নারপাড়ের আতাউর রহমান বলেন, তামাক চাষে কোনো ঝুঁকি নেই। একমাত্র শিলাবৃষ্টিই ঝুঁকি। অন্যান্য চাষাবাদে খুব ঝুঁকি রয়েছে। তামাকের আবাদ বাড়ির সবাই মিলে করা যায়। কোম্পানিগুলোও সহযোগিতা করে।

একসময়ে তামাকই ছিল রংপুর অঞ্চলের প্রধান ফসল। ১৯০৮ সালে রংপুর সদরের বুড়িরহাটে ৫০ একর জমিতে স্থাপিত হয় তামাক গবেষণা কেন্দ্র। তবে পরবর্তী সময়ে তামাকের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনায় ২০০৫ সালে কেন্দ্রটি পাল্টে পরিণত হয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি ভুট্টা, সূর্যমুখী, সরিষা, বাদামসহ শাকসবজি চাষ করে চাষিরা যাতে তামাকের চেয়ে বেশি লাভ পেতে পারেন সে বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছে।

রংপুরের বুড়িরহাট আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ আশিষ কুমার সাহা জানান, প্রচলিত ফসলই চাষ করতেন কৃষকরা। কিন্তু গত বছর আলুতে দাম না পাওয়ার কারণে কৃষকরা বিকল্প চাষ হিসেবে সাময়িকভাবে তামাক চাষ করছেন।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ওবাইদুর রহমান মন্ডল দেশ রূপান্তরকে জানান, তামাক নিষিদ্ধকরণ আইন থাকলেও বিভিন্ন কোম্পানি কৃষকদের লোভ দেখিয়ে তামাক চাষ করে নিচ্ছেন। তাই কোনোভাবেই কৃষকদের ঠেকানো যাচ্ছে না।

রংপুর বিভাগীয় কৃষক সমিতির সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানীর ভাষ্য, ধান, আলুসহ কৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলেই তামাক চাষ কমানো সম্ভব। আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.