নাগেশ্বরীেত দুধকুমারে জমজমাট বালু ব্যবসা

নাগেশ্বরী(কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি) :
নাগেশ্বরীতে দুধকুমার খননের কথা বলে চলছে রমরমা বালু ব্যবসা। স্থানীয় সিন্ডিকেটের সাথে চুক্তিতে বালু উত্তোলন করছে বিআইডব্লিউটি এর ড্রেজার। ফলে ভেঙে পড়ছে ফসলী জমি। বাড়ছে ভাঙনের শঙ্কা। বালু স্তুপ করায় নষ্ট হচ্ছে জমি। এ নিয়ে সংঘর্ষ ও মামলার ঘটনাও ঘটেছে। এতোসবেও নীরব স্থানীয় প্রশাসন।
জানুয়ারীর শুরুর দিকে অভিযোগ পেয়ে নাগেশ^রী উপজেলার বামনডাঙ্গার বড়মানী এলাকায় গিয়ে দেখা যায় বিআইডব্লিউটি এর একটি ড্রেজারে বালু উত্তোলন চলছে। পশ্চিমপাড়ে বালুর স্তুপ করা হচ্ছে কয়েক একর জমিতে। পূর্বপাড়ে বিস্তৃত এলাকায় ফসলী জমিতে বালু রাখা হয়েছে স্তুপ করে।
দুধকুমারের পূর্বপাড়ের কৃষক জহুরুল হক। দুধকুমারের পেটে গেছে সব জমি। কয়েকবছর পর কিছু জমি ফিরে পেয়ে তাতে বুনেছেন ডাল। পাশে করেছেন বীজতলা। কিন্তু বিনা বর্ষাতে দুধকুমারে ভেঙে পড়ছে সে ক্ষেত। তাদের কয়েকবিঘা জমির ক্ষেতের উপর করা হয়েছে বালুর স্তুপ। ভেঙে পড়ছে দুধকুমারে। নদী খননের নাম করে তার সর্বনাশ করেছে স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী চক্র।
ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক জহুরুল হক বলেন, ড্রেজার লাগে বালা তুলছে। তাতে জমি ভেঙে পড়ছে। বাঁধা দিলে বলে নদীর কাজ হচ্ছে। এটা নদী খনন না। সব ওদের কারসাজি। অভিযোগ করেন তাদের তিন শরিকের ২২ বিঘা জমির বেশিরভাগের উপর বালু রাখা হয়েছে। অভিযোগ করেন কৃষক নুর ইসলাম। বলেন, জমিগুলায় এবার আবাদ হতো। এমন সময় বালু তোলা জমিতে রাখলো। বাধা দিতে গেলে আইনের ভয় দেখায়। পূর্বপাড়ের অনেকের অভিযোগ নদী খননের নাম করে বালু রাখা হয়েছে তাদের জমিতে।
দুধকুমারের পশ্চিমপাড়েও বালু তুলে রাখা হয়েছে কয়েক বিঘা জমিতে। স্থানীয় আমজাদ হোসেন ও আরিফসহ তাদের সিন্ডিকেটের সাথে চুক্তিতে ড্রেজিং বোটের লোকজন চালাচ্ছে বালুর রমরমা ব্যবসা। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, চক্রের সাথে মিলে বালু তুলে এলাকাগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে তারা। বালু উত্তোলনকারী শাহ-৭ নামের ড্রেজার বোর্ডটির সুপারভাইজার ফরহাদের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে ক্ষীপ্ত হন তিনি। পরে দাবী করেন সরকারি নদী খনন করছেন তারা। তথ্য চাইলে বলেন, ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করে জেনে নেন। আমাদের কাছে তথ্য নাই। আমাদের দেখায় দেয়। আমরা খনন করি। এসময় তিনি বলেন, ইউএনও উপজেলা চেয়ারম্যানের লিখিত অনুমতি নিয়ে বালু উত্তোলন করছি। তাদের সাথে কথা বলেন।
স্থানীয়রা জানান, এলাকার আমজাদ হোসেন, আরিফ হোসেন, এনামুল হকসহ একটি সিন্ডিকেট এ বালুর রাজ্য গড়ছেন। নদীপাড়ের মানুষ ও জমির মালিকদের বলছেন নদীর পাড় বাঁধের কাজ হবে সেই বালু তোলা হচ্ছে। সিন্ডিকেটের এনামুল হকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বালু তুলি না কি করি সেটা ইউএনও বুঝবে। এছাড়া কথা কথা বলতে চাননি তিনি। সিন্ডিকেটের মূল আরিফ বলেন, এসব বালু তোলা হচ্ছে এখানে উন্নয়নমূলক কাজ হবে সে জন্যই। এ বালু বিক্রি করা হবেনা। আমজাদ হোসেন দাবী করেন, তার নিচু জমি উঁচু করতেই বালুর স্তুপ করেছেন তিনি। জমিতে বালু রাখতে বাঁধা দেয়ায় প্রতিবেশীকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আহত জমির মালিক হাসপাতাল থেকে ফিরে থানায় অভিযোগও করেছেন।
এ ব্যাপারে নাগেশ^রী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর আহমেদ মাছুমের সাথে কথা হলে তিনি প্রথমে জানান, স্থানীয় কিছু লোক আবেদন নিয়ে এসেছিল। তারা যেটা দাবী করেছে, বালু তুলে নদীর পাড়ের রাখলে ভাঙন কমবে। বন্যার পানি ভিতরে প্রবেশ করবেনা। এমন বেশ কিছু জনকল্যাণমূলক দাবী ছিল তাদের। কিন্তু আমি বালু তোলা বা রাখার অনুমতি দিতে পানিরা। এ কারণে আবেদনটির বিষয়ে দেখেশুনে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএ এর কাছে পাঠিয়েছি। আমি শুনেছি বিআইডব্লিউটিএ সেখানে নদী খননের কাজ করছে। তবে কী কাজ করছে কতটুকু করছে আমরা জানিনা।
একই কথা বলেন নাগেশ^রী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোস্তফা জামান। বলেন, এলাকার লোকজনদের বারবার বলা হয়েছে জনগণের যাতে উপকার হয় সে রকম হলে তারা সেটা করবে। লোকজনের ক্ষতি করে কোন কাজ করা যাবেনা।
সংশ্লিষ্টদের দাবী এলাকার উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বালু তোলা হচ্ছে। আসলে বালু বিক্রি করা হয় কিনা জানতে কয়েকদিন অপেক্ষার পর জানা যায় বালুগুলো বিক্রি করছে তারা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় ৮/১০টির মত ট্রাক্টর লাগিয়ে বালু পরিবহন করা হচ্ছে। এসব বালু মহাসড়কে চলমান কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রানা বিল্ডার্সের কাছে বিক্রি করছেন বলে স্বীকার করেন সিন্ডিকেটের লোকজন। বালু বিক্রি নিয়ে আরিফ জানান, বালু বিক্রি না করলে পেট চলবে কেমনে। আমার তো খরচ হইছে। তবে পরিবহনে ব্যস্ত থাকা ট্রাক্টরের মধ্যে তার দুটি বলে দাবী করেন তিনি। নিচু জমি ভরাট করার কথা বলা আমজাদ হোসেনের সাথে মুঠোফোনে বারবার কল করলেও রিসিভ করেননি আমজাদ।
বালু বিক্রি হচ্ছে জানার পর পুনরায় কথা হয় নাগেশ^রী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর আহমেদ মাছুমের সাথে। এ সময় তিনি বলেন, ওইখানে আমাদের কিছু করার নেই। ওটা নদীর ব্যাপার। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বিষয়টি দেখতে বলেছি। তারা দেখে ব্যবস্থা নেবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দুধকুমারে এখনও বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করেনি তারা। বিআইডব্লিউটিও খননের কাজ করছে শুনছেন। তবে কোন তথ্য নেই তাদের কাছে। অপরিকল্পিত খননে পরবর্তীতে ভাঙনের তীব্রতা বাড়ার শঙ্কা জানান এ কর্মকর্তা।
বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, নদী খননের নাম করে আসা বিআইডব্লিউটি এর ড্রেজারটি দুই বছর ধরে দুধকুমারের বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন করছে। বর্তমানে বামনডাঙা ইউনিয়নের ওয়াব্দা বাজারের পাশে আয়নালের ঘাট এলাকায় একইভাবে বালু তুলছে। এর আগে পাশর্^বর্তী তুলেছে কালিগঞ্জে। সর্ব প্রথম উপজেলার রায়গঞ্জে তাদের উত্তোলন করা বালু জব্দ করে ৩০ লাখ টাকা টেন্ডারমূল্য নির্ধাণ করে উপজেলা প্রশাসন। জেলায় বিআইডব্লিউটি এর অফিস না থাকায় তাদের কারো সাথে যোগাযোগ করা যায়নি। এখানকার কাজে অবস্থানকারীদের কাছে যোগাযোগের মাধ্যমে চাইলেও তারা দিতে চাননা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.