mail-google

ইশরাত জাহান চৌধুরী, মৌলভীবাজার :: বাংলাদেশের সিলেট-মৌলভীবাজার-শমশেরনগর ট্রানজিট সড়ক ব্যবহার করে চাতলাপুর চেকপোষ্ট হয়ে কঠোর পুলিশী নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করেছে ভারতীয় জ্বালানি তেলের ট্যাংকার। ভারতের মেঘালয় থেকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আসা জ্বালানি তেলবাহী ১০টি লরির প্রথম চালান গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় চাতলাপুর ও ত্রিপুরার মনু চেকপোষ্টে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের শিল্প, বাণিজ্য ও শিক্ষামন্ত্রী তপন চক্রবর্তী। এসময় ত্রিপুরার উনকোটি জেলার উচ্চপর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা ছাড়াও ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। রাত ১১টায় জ্বালানী তেলের লরি চাতলাপুর চেকপোষ্টে পৌছার পর ইমিগ্রেশন ও শুল্ক বিভাগের আনুষ্ঠানিকতা শেষে চেক পয়েন্টে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়া হয় জ্বালানী তেল ট্যাংকারের ১০ জন চালক, সহকারী চালক ও সফরসঙ্গী ভারতের ওয়েল কর্পোরেশন কর্মকর্তাদের। রাত সাড়ে ১০টায় কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর বাজার অতিক্রম করার সময় শত শত উৎসুক জনতা ভারতীয় তেলবাহী গাড়িকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। গভীর রাত অবদি ভারতের কৈলাশহরে ট্রানজিটের মাধ্যমে আগত জ্বালানী তেলের লরি দেখতে উৎসুক জনতার ঢল নেমেছিল। এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টায় ভারতের মেঘালয় থেকে সিলেটের গোয়ানইঘাট উপজেলার তামাবিল সীমান্ত দিয়ে ভারতের ৯টি জ্বালানি তেলবাহী ও ১টি গ্যাসবাহী লরির প্রথম চালান বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল সোয়া ৪টায় লরিগুলো সড়কপথে সিলেট হয়ে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর শুল্ক স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। প্রতিবেশী ভারত সাময়িক ট্রানজিট সুবিধায় বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে দেশটির উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম থেকে পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাস আরেক রাজ্য ত্রিপুরায় প্রবেশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে এ পণ্য পারাপার শুরু হয়েছে। প্রতিদিন (দিনের বেলা) সর্বোচ্চ ৮০টি লরিতে জ্বালানি পরিবহন করতে পারবে ভারত। এ পণ্যের জন্য প্রতিটনে ১ টাকা ২ পয়সা করে মাসুল পাবে বাংলাদেশ। এজন্য গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের সঙ্গে ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটিডের (আইওসিএল) মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত (এমওইউ) হয়েছে।
সংশ্লিস্ট সূত্রে জানা যায়- ভারতীয় ট্যাংকারগুলো উত্তর আসামের বঙ্গাইগাঁও থেকে যাত্রা করে মেঘালয়ের ডাউকি সীমান্ত দিয়ে সিলেটের তামাবিল-মৌলভীবাজার-শমশেরনগর-চাতলাপুর হয়ে প্রায় ৫ ঘণ্টায় ১৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর ত্রিপুরার কৈলাশহরে প্রবেশ করে। ত্রিপুরায় জ্বালানি তেল সরবরাহের পর খালি ট্যাংকারগুলো একই পথে ভারতে ফিরে যাবে। এসব পণ্য ৪০০ কিলোমিটারের বেশি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ত্রিপুরায় নিতে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে। তাছাড়া মেঘালয় ও দক্ষিণ আসাম হয়ে জাতীয় মহাসড়কের অবস্থাও খারাপ। সম্প্রতি ভারি বর্ষণ এবং পাহাড়ি ভূমিধসের কারণে আসাম থেকে ত্রিপুরাগামী সড়কপথ (এনএইচ-৪৪) ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্রিপুরার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ত্রিপুরা রাজ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
জানা যায়- বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করে ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে জ্বালানী পরিবহনের জন্য গত ১৮ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটিডের (আইওসিএল) মধ্যে স্বাক্ষরিত (এমওইউ) সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহার করে ভারতীয় জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংক লরি ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ত্রিপুরায় যাতায়াত করবে। তবে এক্ষেত্রে ভারতকে সড়কের ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বাবদ নির্ধারিত ফি দিতে হবে। চাতলাপুর চেকপাষ্টের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা সুমন মিয়া জানান- এই চেকপোষ্ট দিয়ে শনিবার রাত সোয়া ১১টায় ভারতীয় জ্বালানি তেলের বহর চাতলাপুর চেকপোষ্টে পৌছে। মৌলভীবাজার থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত ৩৪ কি:মি: সড়ক ও জনপথের এ সড়কটির বেশীর ভাগ অংশই সরু ও দুর্বল। ভারতীয় জ্বালানি তেলের বহরের কারণে প্রাথমিকভাবে এ অংশে ট্রাফিক জ্যামসহ সড়কের কিছু ক্ষতি হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে বলে এলাকাবাসী মনে করেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ, মৌলভীবাজার এর নির্বাহী প্রকৌশলী উৎপল সামন্ত এ প্রতিনিধিকে বলেন- আপাতত চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ভারত এ সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ অংশে সিলেট থেকে চাতলাপুর চেকপোষ্ট পর্যন্ত সড়কের অবস্থা সম্পর্কেও উৎপল সামন্ত বলেন- আপাতত তেমন ভারী ভারতীয় যানবাহন চলাচল করবে না। সুতরাং সড়কের তেমন কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন- বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, ত্রিপুরার জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধন এবং সর্বোপরি মানবিক অবস্থা বিবেচনায় বাংলাদেশ এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়েছে। এর আগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ত্রিপুরায় খাদ্য শস্য ও ভারি যন্ত্রপাতি বহনে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয় সরকার। আসাম ও মেঘালয়ের গতানুগতিক বন্ধুর পথ এড়িয়ে গত মাসে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে ২ হাজার ৩শ ৫০ টন চালের নতুন একটি চালান ত্রিপুরায় পাঠিয়েছে ভারতের খাদ্য করপোরেশন (এফসিআই)। এর আগে ত্রিপুরায় ৭শ ২৬ মেগাওয়াট ‘পালটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র’ নির্মাণের জন্য ভারী যন্ত্রপাতিসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম পরিবহনে ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন লিমিটেডকে (ওএনজিসি) বাংলাদেশের পথ ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সরু একটি পাহাড়ি ভূমি রয়েছে। চড়াই-উৎরাইয়ের ওই পথে যানবাহন বিশেষ মালবোঝাই ট্রাক চলাচল খুবই কঠিন। সড়ক পথে গুয়াহাটি হয়ে আসাম থেকে কলকাতার দূরত্ব ১ হাজার ৬শ ৫০ মাইল, দিল্লির দূরত্ব ২ হাজার ৬শ ৩৭ মাইল। কিন্তু বাংলাদেশ হয়ে আগরতলা ও কলকাতার মধ্যে দূরত্ব মাত্র ৬শ ২০ কিলোমিটার। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটানা এ পেট্রোপণ্য যাবে আসাম থেকে বাংলাদেশ হয়ে ত্রিপুরায়। বাংলাদেশের সড়ক পথ ব্যবহার করে এটি হবে পেট্রোপণ্যের প্রথম চালান। ভারতের আইওসি নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ট্যাংকার দিয়ে এ পেট্রোপণ্য পারাপার করবে। সিলেট ডাউকী স্থলবন্দর দিয়ে এ পণ্য প্রবেশের পর মৌলভীবাজার বাইপাস হয়ে শমশেরনগর-চাতলাপুর স্থলবন্দর অতিক্রম করে ত্রিপুরার কৈলাশহর মনু স্থলবন্দর দিয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।