মনজুরুল ইসলাম
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও ঘনিয়ে উঠেছে যুদ্ধের কালো মেঘ। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলটি বিশ্বরাজনীতির অগ্নিগর্ভ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনা যেন নতুন করে এক বিস্ফোরণের পূর্বাভাস দিচ্ছে। কূটনৈতিক টানাপোড়েন, সামরিক মহড়া, পাল্টাপাল্টি হুমকি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্য বারবার রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সম্পদের প্রাচুর্য, কৌশলগত অবস্থান এবং ঐতিহাসিক বিরোধ—এই তিনের সমন্বয় অঞ্চলটিকে করে তুলেছে অতি সংবেদনশীল। ফলে একটি ছোট ঘটনা থেকেও বড় সংঘাতের সূত্রপাত হওয়ার আশঙ্কা সবসময় থেকেই যায়।
বর্তমানে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা শুধু আঞ্চলিক নয়—এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে গোটা বিশ্বে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা ইতোমধ্যেই লক্ষণীয়। তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি। আমদানি নির্ভর অর্থনীতি, যেমন বাংলাদেশ, এতে বড় ধরনের চাপে পড়ে। শিল্প, পরিবহন, কৃষি—সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য।
শুধু অর্থনীতি নয়, মানবিক দিক থেকেও এই পরিস্থিতি ভয়াবহ। যুদ্ধ মানেই জীবনহানি, বাস্তুচ্যুতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন। সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। একটি সম্ভাব্য সংঘাত নতুন করে শরণার্থী সংকট তৈরি করতে পারে, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে আরও নড়বড়ে করে তুলবে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন জাগে—বিশ্ব কোন পথে এগোচ্ছে? সংঘাতের দিকে, নাকি শান্তির পথে?
সমাধানের পথ একটাই—সংলাপ ও কূটনীতি। শক্তির প্রদর্শন সাময়িক আধিপত্য আনতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখন আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট নিরসন কঠিন।
বিশ্বনেতাদের উচিত উত্তেজনা না বাড়িয়ে সংযম প্রদর্শন করা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতে হবে। কারণ একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ খুব সহজেই বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে—যার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় দেশের জন্য এই পরিস্থিতি একটি সতর্ক সংকেত। আমাদের কূটনৈতিকভাবে সজাগ থাকতে হবে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে।
শেষ কথা হলো—যুদ্ধ কখনো সমাধান নয়, বরং নতুন সংকটের জন্ম দেয়। আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যে বারুদের গন্ধ ভাসছে, তখন বিশ্ববাসীর একটাই প্রত্যাশা—বিবেকের জাগরণ ঘটুক, আর শান্তির পথেই এগিয়ে যাক মানবসভ্যতা।
**
লেখক: সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক,মহাকাল গবেষক,সমাজ সংস্কারক ও মানবাধিকার কর্মী
