মনজুরুল ইসলাম।
ভোরের আলো ফুটতেই সার বিক্রির দোকানের সামনে কৃষকের দীর্ঘ সারি। কারও হাতে টাকা, কারও হাতে কৃষি কার্ড। চোখেমুখে একটাই প্রত্যাশা—আজ অন্তত সার নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকের হাতে জোটে না প্রয়োজনীয় সার।
একদিকে দোকানের সামনে কৃষকের ভিড়, অন্যদিকে বাজারে একই সারের বেশি দাম—এই বৈপরীত্যই যেন এখন দেশের সার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সার কি সত্যিই নেই?
নাকি সার আছে, কিন্তু কৃষকের জন্য নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসছে ডিলারদের মজুত, বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং একটি অংশের বিরুদ্ধে ওঠা সিন্ডিকেট ও কালোবাজারির অভিযোগ।
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সম্প্রতি সার না পেয়ে কৃষকদের ক্ষোভ চরমে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা একটি ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রায় ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের পর প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয় এবং ১০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া অবশ্যই আইনসম্মত নয়। কৃষকের ক্ষোভ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কিন্তু এই ঘটনার আরেকটি দিকও আছে।
কৃষকেরা কেন এতটা ক্ষুব্ধ হলেন?
কেন একজন কৃষক সার পাওয়ার জন্য ডিলারের দোকানে গিয়ে ফিরে আসবেন, অথচ বাজারে বেশি দামে সার পাওয়া যাবে—এই প্রশ্নের উত্তরও জরুরি।
কারণ ক্ষোভ কখনো হঠাৎ জন্ম নেয় না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, বঞ্চনা ও অনাস্থা জমতে জমতেই একসময় বিস্ফোরণ ঘটে।
কৃষকদের একটি অংশের অভিযোগ, দিনের বেলায় সীমিত পরিমাণ সার বিতরণ দেখানো হলেও প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত সার দেওয়া হচ্ছে না। আবার রাতের আঁধারে খুচরা বাজারে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের প্রতিটি সত্য—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগ যখন বারবার উঠছে, তখন তা তদন্তের দাবি রাখে।
একজন ডিলার কত বস্তা সার বরাদ্দ পেলেন?
কত বস্তা উত্তোলন করলেন?
কত বস্তা গুদামে রয়েছে?
কত বস্তা কৃষকের কাছে বিক্রি হলো?
কোন কৃষক কত সার কিনলেন?
আর অবশিষ্ট সার কোথায় গেল?
এই পাঁচ-ছয়টি প্রশ্নের উত্তর যদি ডিজিটাল ব্যবস্থায় পাওয়া যায়, তাহলে সার নিয়ে অনেক রহস্যই আর রহস্য থাকবে না।
সার ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই—কাগজের হিসাব আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে যদি দূরত্ব তৈরি হয়, তাহলে সংকট অনিবার্য।
সরকারি বরাদ্দ রয়েছে, আমদানি রয়েছে, গুদাম রয়েছে—তারপরও কৃষক সার পাচ্ছেন না। তাহলে মাঝখানের কোথাও না কোথাও সমস্যা আছে।
সেই সমস্যাটি হতে পারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়। হতে পারে পরিবহনে। হতে পারে মজুত ব্যবস্থাপনায়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিও থাকতে পারে।
তাই ঢালাও অভিযোগ নয়; প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক তদন্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে ভূরুঙ্গামারীতে খুচরা দোকানে সার বিক্রির অভিযোগে বিএডিসি সার ও বীজ ডিলার মেসার্স ফরহাদ এন্ড ব্রাদার্সকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেউ যদি সরকারি নিয়ম ভেঙে কৃষকের প্রাপ্য সার অন্যত্র বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভ করেন, তাহলে সামান্য অর্থদণ্ড কি তাকে নিবৃত্ত করার জন্য যথেষ্ট?
প্রশ্নটি শুধু একজন ডিলারকে নিয়ে নয়।
আইন যদি লাভের তুলনায় দুর্বল হয়, তাহলে অপরাধের ঝুঁকি কমে যায়।
তাই গুরুতর অনিয়মের ক্ষেত্রে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে ডিলারশিপ বাতিল, মজুত জব্দ, মামলা এবং ভবিষ্যতে সরকারি সার ব্যবসা থেকে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।
সারের সংকট মানে শুধু একটি পণ্যের সংকট নয়।
সার না পেলে কৃষক সময়মতো জমিতে প্রয়োগ করতে পারেন না। সময়মতো প্রয়োগ না হলে ফলন কমতে পারে। উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। আর উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কৃষকের লাভ কমে যায়।
অর্থাৎ একটি বস্তা সার নিয়ে অনিয়মের প্রভাব শেষ পর্যন্ত কৃষকের ঘর থেকে বাজার—সব জায়গাতেই পড়ে।
যে কৃষক দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করেন, সেই কৃষককেই যদি উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ সংগ্রহ করতে হয় দালাল, সিন্ডিকেট কিংবা কালোবাজারির দ্বারস্থ হয়ে—তাহলে সেটি শুধু কৃষকের ব্যর্থতা নয়, আমাদের ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।
ডিলারদের অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই শুধু ডিলারদের দিকে আঙুল তোলা যথেষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠবে তদারকি ব্যবস্থার দিকে।
একটি গুদামে দিনের পর দিন সার পড়ে থাকল, অথচ কৃষকেরা সার পেলেন না—এটি কি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরে পড়েনি?
কোন ডিলার কত সার বিক্রি করছেন, কোথায় বিক্রি করছেন, নির্ধারিত দামে বিক্রি করছেন কি না—এসব দেখার দায়িত্ব যাদের, তাদের নজরদারি কতটা কার্যকর?
যদি কোথাও দায়িত্বে অবহেলা থাকে, সেখানেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সার নিয়ে সিন্ডিকেটের অভিযোগ বন্ধ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।
সরকারি গুদাম থেকে ডিলারের গুদাম পর্যন্ত প্রতিটি চালান ডিজিটালভাবে নথিভুক্ত করা যেতে পারে। এরপর ডিলারের কাছ থেকে কৃষকের কাছে বিক্রির তথ্যও অনলাইনে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
ডিলারের দোকানের সামনে প্রতিদিনের মজুত ও বিক্রয়মূল্য প্রকাশ করা যেতে পারে।
কৃষক মোবাইল ফোনে জানতে পারবেন—তার এলাকার কোন ডিলারের কাছে কত সার আছে।
অভিযোগের জন্য থাকতে পারে তাৎক্ষণিক হটলাইন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আকস্মিক গুদাম পরিদর্শন।
যে গুদামের হিসাবের সঙ্গে বাস্তব মজুত মিলবে না, সেখানেই তদন্ত শুরু হওয়া উচিত।
ভূরুঙ্গামারীর গুদাম ভাঙার ঘটনা কোনোভাবেই ভবিষ্যতের সমাধান হতে পারে না। কিন্তু এটি প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কসংকেত।
আজ সার নিয়ে ক্ষোভ। কাল সেই ক্ষোভ অন্য কোনো কৃষি উপকরণ নিয়ে বিস্ফোরিত হতে পারে।
তাই কৃষকের ক্ষোভকে অপরাধ দিয়ে শুরু করে শুধু শাস্তিতে শেষ না করে—ক্ষোভের কারণটিও খুঁজে বের করতে হবে।
কৃষক যেন সার পাওয়ার জন্য গুদামের দরজা ভাঙতে না যান; বরং সরকারি ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় সার কিনে বাড়ি ফিরতে পারেন—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
সারের বাজারে সংকট থাকলে সরকারকে সরবরাহ বাড়াতে হবে। সংকট না থাকলেও যদি বাজারে সংকট দেখা দেয়, তাহলে কোথায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে।
ডিলারদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ মিথ্যা হলে নির্দোষ ব্যবসায়ীদেরও হয়রানি করা যাবে না।
অর্থাৎ প্রয়োজন প্রতিহিংসা নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত; লোক দেখানো অভিযান নয়, স্থায়ী সংস্কার।
কৃষকের হাতে সময়মতো ন্যায্যমূল্যের সার পৌঁছানো শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়—এটি রাষ্ট্রের খাদ্যনিরাপত্তার অঙ্গীকার।
সার গুদামে পড়ে থাকবে, আর কৃষক সার না পেয়ে মাঠে বসে থাকবেন—এই বৈপরীত্যের অবসান এখনই জরুরি।
কারণ কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো মানেই শুধু একটি বস্তা সার বিক্রি নয়;
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি ফসলের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা।
লেখক,সাংবাদিক, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক ও মহাকাল গবেষক।
