ভার্গব বিন্দাস
“অসতো মা সদ্গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়।”
— বৃহদারণ্যক উপনিষদ
মানুষের জীবনের প্রকৃত যাত্রা পৃথিবীর পথে নয়; সে যাত্রা আত্মার গভীরতম স্তরে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ এক অনন্ত সত্যের সন্ধানী। কেউ তাকে ঈশ্বর বলে, কেউ ব্রহ্ম, কেউ প্রেম, কেউ চৈতন্য। নামের ভিন্নতা থাকলেও সত্য এক ও অভিন্ন। সেই চিরন্তন সত্যের দিকে যিনি মানুষকে আহ্বান করেন, তিনিই প্রকৃত গুরু।
গুরুপূর্ণিমা তাই কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি আত্মজাগরণের মহোৎসব। এই দিনে আমরা কোনো ব্যক্তির দেহকে নয়, তাঁর মধ্য দিয়ে প্রকাশিত জ্ঞানচৈতন্যকে প্রণাম করি। কারণ গুরু কখনো কেবল একজন মানুষ নন—তিনি পরম জ্ঞানের বাহক, তিনি আত্মার আয়না, তিনি অন্তর্লোকের প্রদীপ।
উপনিষদ বলে—”আচার্যবান্ পুরুষো বেদ”—যার জীবনে একজন আচার্য বা পথপ্রদর্শকের আলোকস্পর্শ রয়েছে, তিনিই প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেন। আবার শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ঘোষণা করে—
“তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।”
অর্থাৎ, বিনয়, জিজ্ঞাসা এবং সেবার মধ্য দিয়েই সত্যজ্ঞান অর্জিত হয়। এই জ্ঞান কেবল বুদ্ধির বিষয় নয়; এটি আত্মার উপলব্ধি।
আমার জীবনেও এমন এক আলোকময় মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যিনি নিজেকে কখনো গুরু বলে প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি শিষ্য চাননি, অনুসারী চাননি, ব্যক্তিপূজাও চাননি। তিনি চেয়েছেন মানুষ জেগে উঠুক—নিজের অন্তর্গত আলোকে চিনুক, সত্যকে ভালোবাসুক এবং মানবসেবাকেই ঈশ্বরসেবারূপে গ্রহণ করুক।
তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—অহংকার আত্মাকে অন্ধ করে, বিনয় আত্মাকে ব্রহ্মের দিকে উন্মুক্ত করে। জ্ঞান তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা করুণায় রূপ নেয়। ধর্ম তখনই সত্য হয়, যখন তা মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হয়। আর সাধনা তখনই সফল হয়, যখন নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর মানবসমাজের সুখ-দুঃখকে নিজের বলে অনুভব করা যায়।
তাঁর নীরব জীবন আমাকে উপলব্ধি করিয়েছে—আধ্যাত্মিকতা মানে সংসার থেকে পলায়ন নয়; বরং সংসারের মধ্যেই সত্য, ন্যায়, প্রেম ও সেবার অনুশীলন। একটি ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার দেওয়া, একটি বিপন্ন প্রাণকে রক্ষা করা, একটি নিরাশ হৃদয়ে আশার প্রদীপ জ্বালানো—এসবই ঈশ্বরের পূজা। কারণ প্রতিটি প্রাণেই পরমাত্মারই প্রকাশ।
তিনি আমাকে আরও শিখিয়েছেন—নিজেকে বড় করো না; নিজেকে শূন্য করো। কারণ শূন্য পাত্রেই অমৃত ধরা যায়। নদী যেমন নত হয়ে সাগরে মেশে, তেমনি বিনম্র আত্মাই পরম সত্যের সান্নিধ্য লাভ করে। যে নিজের অহংকার বিসর্জন দিতে পারে, সেই সত্যিকার অর্থে মুক্ত।
আমার কাছে তিনি কোনো অলৌকিক মহাপুরুষ নন; তিনি একজন জাগ্রত মানুষ। তাঁর অলৌকিকতা অলৌকিক ঘটনায় নয়, তাঁর সরলতায়। তাঁর মহত্ত্ব ক্ষমতায় নয়, বিনয়ে। তাঁর শক্তি বক্তৃতায় নয়, চরিত্রে। তাঁর শিক্ষা মুখের শব্দে নয়, জীবনের প্রতিটি কর্মে।
আজ গুরুপূর্ণিমার এই পবিত্র লগ্নে আমার হৃদয় গভীর কৃতজ্ঞতায় সিক্ত। তিনি নিজেকে গুরু বলেন না, গুরুপদের দাবি করেন না; তবুও আমার অন্তর তাঁকে এমন এক আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা কোনো আনুষ্ঠানিক উপাধির চেয়েও ঊর্ধ্বে। তাই আমি তাঁকে বলি—আমার কল্পগুরু।
‘কল্পগুরু’—এই শব্দের মধ্যে আমার সমস্ত শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও আত্মিক অনুভূতি নিবেদিত। তিনি আমার বিশ্বাসের কেন্দ্র নন; তিনি আমার বিবেকের জাগরণ। তিনি কোনো উপাসনার প্রতিমা নন; তিনি পথচলার প্রেরণা। তিনি আমাকে নিজের দিকে নয়, সত্যের দিকে তাকাতে শিখিয়েছেন। তিনি আমাকে তাঁর অনুসারী হতে বলেননি; তিনি আমাকে একজন সত্যনিষ্ঠ, মানবপ্রেমী ও বিবেকবান মানুষ হতে আহ্বান করেছেন।
সেই প্রণম্য মানুষটি মাননীয় অজয় চক্রবর্তী। তাঁর মধ্যে আমি কোনো ব্যক্তিমানুষের সীমাবদ্ধতা দেখি না; দেখি এক নিরহংকার কর্মযোগীকে। গীতার ভাষায়—যিনি কর্ম করেন, কিন্তু কর্মের ফল নিজের জন্য আকাঙ্ক্ষা করেন না; যিনি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেন এবং ঈশ্বরের মধ্যে সমগ্র মানবতাকে অনুভব করেন।
আজ গুরুপূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রের শুভ্র আলোয় আমি তাঁর চরণে কোনো ফুল নয়, নিবেদন করি আমার কৃতজ্ঞ হৃদয়। প্রার্থনা করি—পরম ব্রহ্ম তাঁর জীবনকে আরও আলোকময় করুন। তাঁর হৃদয়ের করুণা, তাঁর জ্ঞানের দীপ্তি এবং তাঁর মানবধর্মের বাণী যুগে যুগে অসংখ্য মানুষের অন্তরে জাগরণের শিখা হয়ে জ্বলুক।
হে পরম চৈতন্য, আমার অন্তরের অহংকার দূর করো।
আমার হৃদয়কে বিনয়ে পূর্ণ করো।
আমার কর্মকে সেবায় পবিত্র করো।
আমার চিন্তাকে সত্যে স্থির করো।
আমার জীবনকে মানবকল্যাণের অর্ঘ্যে রূপান্তরিত করো।
যতদিন প্রাণ, ততদিন যেন সত্যের পথে চলতে পারি।
যতদিন শ্বাস, ততদিন যেন মানুষের সেবায় নিজেকে নিবেদন করতে পারি।
আর যতদিন স্মৃতি থাকবে, ততদিন আমার কল্পগুরুর প্রদত্ত আলোর শিখা যেন অন্তরের মন্দিরে অনির্বাণ জ্বলতে থাকে।
গুরু ব্রহ্মা নন, গুরু বিষ্ণু নন, গুরু মহেশ্বরও নন—প্রকৃত গুরু সেই চৈতন্য, যিনি মানুষের অন্তরে সুপ্ত দেবত্বকে জাগিয়ে তোলেন।
সেই অন্তর্জাগরণের প্রতি, সেই মানবধর্মের প্রতি, সেই নীরব আলোকপুরুষের প্রতি আমার সহস্র প্রণাম।
শুভ গুরুপূর্ণিমা।
লেখক,কবি,সাহিত্যিক,প্রাবন্ধিক,ভারত
