হক মোঃ ইমদাদুল
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্য হিসেবে শেওলার ব্যবহার দীর্ঘদিনের। জাপান, কোরিয়া ও চীনের মতো উন্নত দেশগুলোতে এটি একটি সাধারণ খাদ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। বাংলাদেশে শেওলার ব্যবহার এখনও সীমিত, তবে এর পুষ্টিগুণ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে এটি ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস হয়ে উঠতে পারে। এই নিবন্ধে শেওলার ইতিহাস, পুষ্টিগুণ, জাপানে এর গুরুত্ব, বাংলাদেশে এর চাষাবাদের সম্ভাবনা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
শৈবাল বা শেওলার ইতিহাস
শৈবাল বা শেওলার ইতিহাস কয়েক হাজার বছর পুরোনো। চীন, জাপান ও কোরিয়াতে প্রায় ২০০০ বছর আগে থেকেই এটি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রাচীনকালে শেওলার ব্যবহার মূলত পূর্ব এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল, তবে বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
প্রাচীন যুগ
চীনের ঐতিহাসিক নথিতে ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দস্তাবেজে শেওলার ব্যবহার সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়।
জাপানের প্রাচীন নথিপত্রে উল্লেখ আছে যে ৭২০ খ্রিস্টাব্দে রচিত “নিহন শোকি” (Nihon Shoki) নামক ইতিহাস গ্রন্থে শেওলার ব্যবহার সম্পর্কে বিবরণ রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে জাপানিরা বহু আগেই শেওলাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
কোরিয়ায় রাজকীয় পরিবার ও অভিজাত শ্রেণি একে একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করত।
মধ্যযুগ
এদো যুগ (১৬০৩-১৮৬৮) থেকে জাপানে শেওলার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। সে সময় এটি শুধু রাজপরিবার বা ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সাধারণ জনগণও এটি গ্রহণ করতে শুরু করে।
চীনে এই সময় শেওলা ওষুধ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো, বিশেষ করে আয়োডিনের ঘাটতি দূর করার জন্য।
ইউরোপেও শেওলার প্রতি কিছুটা আগ্রহ দেখা দেয়, যদিও খাদ্য হিসেবে এটি জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে চিকিৎসা ও কৃষিকাজে এটি ব্যবহৃত হতে থাকে।
আধুনিক যুগ
শিল্প বিপ্লবের পর, আধুনিক কৃষি ও প্রযুক্তির সহায়তায় শেওলা উৎপাদন একটি বৃহৎ শিল্পে পরিণত হয়।
১৯৪০-এর দশকে জাপানে শেওলা চাষের উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কার করা হয়, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
বর্তমানে চীন, জাপান ও কোরিয়া বিশ্বের প্রধান শেওলা উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
২১ শতকের শুরু থেকে পশ্চিমা বিশ্বেও শেওলার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিদের মধ্যে।
বর্তমানে, এটি বিশ্বব্যাপী খাদ্য ও ওষুধ শিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পুষ্টিগুণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে এর গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে।
খাবারের শেওলার প্রকারভেদ
জাপানিরা খাবারে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের শেওলা, যেগুলি প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। প্রতিটি শ্রেণী তাদের রঙ এবং ব্যবহার অনুযায়ী আলাদা। নিচে জাপানে ব্যবহৃত শেওলার প্রকারভেদ এবং তাদের ব্যবহার দেওয়া হলো:
১. সবুজ শেওলা (Green Algae)
এগুলি সবুজ রঙের শেওলা, যা সাধারণত স্যালাড, স্যুপ এবং স্বাস্থ্য পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
উলভা (Ulva) – স্যালাড ও অন্যান্য রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
স্পাইরুলিনা (Spirulina) – একটি নীল-সবুজ শেওলা, যা স্বাস্থ্য পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২. বাদামী শেওলা (Brown Algae)
এগুলি বাদামী বা হলুদাভ রঙের শেওলা, যা স্যুপ, ঝোল, স্য্যালাড এবং অন্যান্য রান্নায় ব্যবহৃত হয়।
কোম্বু (Kombu) – দাশি (সুপ) ও ঝোল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
ওয়াকামে (Wakame) – স্যুপ ও স্যালাডে ব্যবহৃত হয়।
ফুনোরি (Funori) – স্যালাড এবং স্যুপে ব্যবহৃত হয়।
সারগাসাম (Sargassum) – চীন ও কোরিয়াতে খাবারের পাশাপাশি ওষুধি গুণের জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩. লাল শেওলা (Red Algae)
এগুলি লাল বা গা dark ় রঙের শেওলা, যা সুশি, স্যুপ বা খাবারের টপিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
নোরি (Nori) – সুশি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
পোরফাইরা (Porphyra) – এটি নোরির মতোই ব্যবহৃত হয়, প্রোটিন এবং ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ।
ওগোনোরি (Ogonori) – আগার-আগারের উৎস, সুশি ও অন্যান্য খাবারে ব্যবহৃত হয়।
৪. অন্যান্য বিশেষ শেওলা (Other Special Seaweeds)
এই শেওলা কিছু বিশেষ খাবারে ব্যবহৃত হয় এবং স্বাস্থ্য উপকারিতার জন্য পরিচিত।
মজুকু (Mozuku) – এটি জাপানে খুব জনপ্রিয়, বিশেষ করে ভিনেগারে মিশিয়ে খাওয়ার জন্য।
উমিবুদো (Umibudo) – “সি গ্রেপস” নামে পরিচিত, এটি সরাসরি খাওয়া হয়।
৫. ক্লোরেলা (Chlorella) একটি সবুজ শেওলা, যা উচ্চ প্রোটিন সমৃদ্ধ এবং ডিটক্সিফিকেশন ও পুষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি সাধারণত সুপারফুড হিসেবে খাওয়া হয়, বিশেষত স্বাস্থ্য পরিপূরক হিসেবে।
৬. ডালস (Dulse) একটি লাল শেওলা, যা কাঁচা অথবা রান্না করা দু’ভাবেই খাওয়া যায়। এটি সুস্বাদু এবং কিছু ক্ষেত্রে স্যুপ বা সালাদে ব্যবহার করা হয়।
৭. এক্টোকারপাস (Ectocarpus) একটি বাদামী শেওলা, যা কিছু অঞ্চলে খাবারের উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি প্রধানত বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য ব্যবহৃত।
৮. গ্র্যাসিলারিয়া (Gracilaria) একটি লাল শেওলা, যা বিশেষভাবে আগার-আগার উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এটি কিছু অঞ্চলে কাঁচা সালাদ হিসেবেও খাওয়া হয়।
৯. হিজিকি (Hijiki) একটি বাদামী শেওলা যা রান্নার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি অনেক সময় স্যুপ, সালাদ বা চিনি দিয়ে রান্না করা হয়।
১০. মজুকু (Mozuku) হল একটি বিশেষ শেওলা, যা জাপানে ভিনেগারে মিশিয়ে খাওয়ার জন্য বেশ জনপ্রিয়। এটি মূলত সুস্বাদু এবং অনেক পুষ্টিকর।
১১. আঙ্গিওন (Angion) একটি লাল শেওলা, যা মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অঞ্চলে ব্যবহৃত হয়, তবে জাপানে এটি কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এটি প্রোটিন এবং আয়রনের ভালো উৎস হিসেবে পরিচিত।
১২. শিরো সাও (Shiro Sawo) একটি বাদামী শেওলা, যা শোষণ ও পুষ্টি বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি কিছু ঐতিহ্যবাহী জাপানি ডিশে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, বিশেষ করে সুপ এবং স্যালাডে।
১৩. টেম্প্পু (Temp) একটি শেওলা, যা মূলত হালকা এবং সহজভাবে রান্না করা হয়। এটি সাধারণত স্যালাড এবং কিছু বিশেষ ডিশে ব্যবহার করা হয়।
১৪. সেতো (Seto) একটি বাদামী শেওলা, যা মূলত মিষ্টি এবং ঝোল জাতীয় খাবারে ব্যবহার করা হয়। এটি বিশেষ করে এককভাবে শেওলার সুস্বাদু স্বাদ এবং গুণের কারণে ব্যবহৃত হয়।
১৫. আসাওকা (Asaoka) একটি বিশেষ ধরনের শেওলা, যা প্রচলিত নয় তবে কিছু প্রাচীন জাপানি খাবারে ব্যবহৃত হত। এটি একটি স্বাস্থ্যকর শেওলা এবং আয়ুর্বেদিক ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হত।
লেখক, সংগ্রাহক ও গবেষকঃ , জাপান
