তাজিদুল ইসলাম লাল, রংপুর

অধ্যাপক পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শূন্যপদের সংখ্যা ছিল দুটি, কিন্তু আবেদনকারী প্রার্থী ছিলেন একজন। তারপরও একমাত্র প্রার্থী ড. তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপকের শূন্যপদে নিয়োগ নিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় নিয়োগ-বোর্ড অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নয়। তবু শুধু বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার জন্য ২০২১ সালে নিয়মের তোয়াক্কা না করেই অধ্যাপক পদে (গ্রেড-৩) নিয়োগ পেয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি’র) ঐ শিক্ষক। এছাড়াও নিয়োগের শুরুতে প্রভাষক পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল না ওই শিক্ষকের। তবু সে সময় ড. আবু ছালেহ মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান (তুহিন ওয়াদুদ) প্রভাষক পদে নিয়োগ বাগিয়ে নিয়েছিলেন। অনিয়মের মাধ্যমে অধ্যাপক পদেও বাংলা বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি।
অভিযোগ আছে, অধ্যাপক পদে আবেদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন (অগ্রায়ন) না থাকলেও তাকে নিয়োগ দেয়ার জন্য কঠোর লকডাউন উপেক্ষা করে সিলেকশন বোর্ডের আয়োজন করা ছিল। প্রসঙ্গত, শিক্ষা জীবনের সর্বস্তরে দ্বিতীয় শ্রেণি পাওয়া এই শিক্ষক বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভঙ্গ করে ২০০৯ সালে প্রভাষক হিসেবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
জানা যায়, গত ১২ জানুয়ারি’২০২১ তারিখে বেরোবির বাংলা বিভাগে দুজন স্থায়ী অধ্যাপক (গ্রেড-৩) নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আবেদনের শেষ তারিখ ছিল গত ২ ফেব্রুুয়ারি ২০২১। রেজিস্ট্রার অফিস সূত্র জানায়, ওই বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে ড. তুহিন ওয়াদুদ একক প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেন। তবে দুটি পদের বিপরীতে একজন প্রার্থীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার নিয়ম নেই।
সূত্র আরও জানায়, অধ্যাপক পদে আবেদন করার সময় প্রভাষক পদে নিয়োগের অনিয়মের কারণে ওই প্রার্থীকে অনমুতি (অগ্রায়ন) দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই হিসেবে তার আবেদনপত্রটিও বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সবকিছুকে উপেক্ষা করে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়।
সূত্র জানায়, ১১ আগস্ট ২০২১ তারিখে বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ শূন্য হয়। ওই বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব দেয়ার জন্যই সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. হাসিবুর রশীদ তড়িঘড়ি করে ওই নিয়োগ সম্পন্ন করেন।
এ বিষয়ে মন্তব্য করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রার কর্নেল (অব.) আবু হেনা মুস্তাফা কামালকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। অধ্যাপকের দুটি শূন্যপদের বিপরীতে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে ড. তুহিন ওয়াদুদের সিলেকশন বোর্ড ২০২১ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়। আবেদনের সময় ড. তুহিন ওয়াদুদকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অগ্রায়ন ও অভিজ্ঞতার সনদ দেয়নি বলেও জানিয়েছেন সংস্থাপন শাখার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
মাত্র একজন প্রার্থী নিয়ে সিলেকশন বোর্ড আয়োজন করার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. হাসিবুর রশীদ এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সার্বিক বিষয়ে আবু ছালেহ মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান (তুহিন ওয়াদুদ) এর সাথে মুঠোফোনে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে সেই নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোন যোগাযোগ করেননি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বায়ান্নর আলোকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন অনিয়ম ও দুর্নীতি রাখা হবে না। আগামী সপ্তাহের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে এসব বিষয় উত্থাপন করা হবে এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের মার্চ মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত ভঙ্গ করে বেরোবিতে প্রভাষক হিসেবে ড. তুহিন ওয়াদুদকে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগও আছে। ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ওই বছরের নভেম্বর মাসে শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। যেখানে আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২০০৮ সালের ১৭ ডিসেম্বর। বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী প্রভাষক পদে আবেদনের যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল শিক্ষাজীবনে সর্বস্তরে প্রথম বিভাগ/শ্রেণি অথবা সিজিপিএ ৩ দশমিক ৫ থাকতে হবে। তবে পিএইচডি ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা বলা থাকলেও একাডেমিক ফলাফলের শর্ত শিথিলের বিষয়ে কিছু বলা ছিল না। অথচ ড. আবু ছালেহ মোহাম্মদ ওয়াদুদুর রহমান (তুহিন ওয়াদুদ) তার শিক্ষা জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই প্রথম শ্রেণি পাননি। তার আবেদনপত্রে দেখা যায়, তিনি ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে মাদ্রাসা বোর্ড থেকে দাখিল ও আলিম পাস করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলা বিভাগে ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এমন একাডেমিক ফলাফল নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও এ বিষয়ে কেউ এতদিন মুখ খোলেননি।
শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা নেই অথচ ‘বড়’ অধ্যাপক বহুরূপী তুহিন ওয়াদুদ! যোগ্যতা নেই প্রভাষক হওয়ার, তিনি অধ্যাপক; যোগ্যতা না থাকার পরেও হয়ে যান প্রভাষক, পরে অধ্যাপক। বিভিন্ন শিরোনামে সম্প্রতি কয়েকটি স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসে বেরোবি প্রশাসনসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো পড়ুন