সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে ঝালকাঠিতে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি :
‘‘স্বাধীনতা যুদ্ধের অর্ধশতাব্দীর পরও আমাদেরকে নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে, নারী দিবস পালন করতে হচ্ছে। উন্নত বিশে^ নারীর প্রতি সহিংসতা কম হলেও আমাদের দেশে তা এখনও ব্যাপকভাবে চলছে। এখনও সামাজিকভাবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান বা প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারছিনা। তবে হতাশা জনক এ পরিস্থিতির মাঝেও নারীর ক্ষমতায়নে কিছু আশাব্যঞ্জক প্রাপ্তি থাকলেও সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর উপর জোর দেয়া উচিত।’’

মঙ্গলবার (৬ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২২ উদযাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন ও জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ঝালকাঠির যৌথ আয়োজনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুগদ্ধা সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় উক্ত সভা।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মোঃ জোহর আলী। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক উম্মে আয়শা সিদ্দিকার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট লতিফা জান্নাতি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রশান্ত কুমার দে, সনাক ঝালকাঠির সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন হিমু, সনাক ঝালকাঠির স্বজন সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা রমা রানী দাস, ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী খলিলুর রহমান প্রমুখ।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস-২০২২ উপলক্ষে সভায় টিআইবি’র ৯ দফা দাবি সম্বলিত ধারণাপত্র উপস্থাপন করা হয়। সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জেন্ডার সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করে টেকসই উন্নয়ন অর্জনে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে ধারণাপত্রে। ধারণাপত্রে উল্লেখিত টিআইবি’র দাবীসমূহ সভায় তুলে ধরেন সনাক, ঝালকাঠির জেন্ডার বিষয়ক উপকমিটির আহ্বায়ক ড. কামরুন্নেছা আজাদ। এবিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের বিবেচনার জন্য টিআইবি’র প্রস্তাবকৃত দাবিসমূহ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।

এর আগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‌্যালির আয়োজন করা হয়। র‌্যালিটি প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে ঝালকাঠি জেলা প্রসাশকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালিতে ঝালকাঠি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেন। টিআইবি’র সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), ব্র্যাক, উদ্দীপন, নারীপক্ষ, এডাবসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ, সনাকের ইয়েস সদস্যবৃন্দ, প্রিন্ট ও ইলেট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ র‌্যালি ও আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোঃ জোহর আলী বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নারীরা কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও প্রশাসনিক দিক থেকে নারীদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। বিশেষ করে ক্যাডার সার্ভিসে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট লতিফা জান্নাতি বলেন, আমরা সকল নারীর প্রতি সমান শ্রদ্ধা, সম্মান বা প্রাপ্য মর্যাদা দিতে পারছিনা। পারিবারিক জীবনে নিজের মেয়ের যেমন মর্যাদা রয়েছে, তেমনি পুত্রবধুও একই রকম মর্যাদা প্রাপ্য। একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মানে পুরুষের সহযোগিতা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই।

টিআইবি’র সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ঝালকাঠির সভাপতি হেমায়েত উদ্দিন হিমু বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে সকল ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে শক্তিশালী করতে নারীদের ৩৩শতাংশ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় উপস্থাপন করা টিআইবির দাবিসমূহ –
১. টেকসই উন্নয়ন অজনের কর্মপরিকল্পনায় অভীষ্ট-৫ ও ১৬ কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধের পূর্বশর্ত হিসেবে দুর্নীতি কমিয়ে আনাসহ সরকারকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করতে হবে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জাতীয় পরিকল্পনা ২০১৩-২০২৫ পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়ন করতে হবে;
২. প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সর্বস্তরে সুশাসন নিশ্চিতের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট পথরেখা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে;
৩. নারী ও শিশু নির্যাতনসহ সকল প্রকার নারী অধিকার হরণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সকল প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ করে প্রশাসন, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধ, শুদ্ধাচার, জবাবদিহিতা ও সার্বিক সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে;
৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে রাজনৈতিক দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলসমূহের আমূল সংস্কার করতে হবে। “গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধিত) আইন ২০০৯” অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে নারী প্রার্থী মনোনয়ন বাড়াতে হবে। সকল রাজনৈতিক দলের কমিটিতে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে;
৫. শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ন্যয়বিচার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব নিশ্চিতে যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীদের সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষকরে জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় অন্যতম প্রতিবন্ধক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র পরিচালনার সকল ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার ও দুর্নীতি প্রতিরোধকে মূলধারাভুক্ত করতে হবে;
৬. দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয় ও সম্পদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দায় সম্পর্কে নারীদের সচেতন করতে প্রচারণা জোরদার করতে হবে। নারীর নামে অবৈধ সম্পদ অর্জনের আইনি বিধান ও সাজা সম্পকে সচেতনতা সৃষ্টিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে;
৭. স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি ও স্থানীয় সরকার, আইনি সংস্থা ও বিচারব্যবস্থাসহ নারীরা সেবা নিতে যান এমন প্রতিষ্ঠানসমূহের সেবাÑ বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে জেন্ডার সংবেদনশীল পদ্ধতিতে তথ্য প্রচার করতে হবে এবং নারীদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে;
৮. সকল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখার নিশ্চয়তাসহ একটি নারীবান্ধব অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতিসহ সকল প্রকার আইনের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
৯. নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বন্ধে ব্যক্তির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান, মর্যাদা ও প্রভাব বিবেচনা না করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.