মনজুরুল ইসলাম,এশিয়ান বাংলা নিউজঃ
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির। অনেক মন্দির কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও কালের স্বাক্ষী কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ^রী উপজেলার কালীগঞ্জ ইউনিয়নের ঐতিহাসিক মাদাইখাল কালী মন্দিরে প্রতিবছরের ন্যায় ২৩২তম বার্ষিক পুজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫ এপ্রিল শনিবার থেকে পুজা আরম্ভ হয় ৮ এপ্রিল মঙ্গলবার মন্দিরে পুজা দিতে আসা মানতকারী পুন্যার্থীদের দেয়া পাঠা বলিসহ ১২ এপ্রিল শনিবার মানতকারী পুন্যার্থীদের দেয়া পাঠা বলি দেয়ার মাধ্যমে পুজার সমাপ্তি ঘোষনা করে মাদাইখাল কালীপুজা ও মেলা আয়োজক কমিটি। উত্তর বঙ্গের অন্যতম পীঠস্থান হিসাবে রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ^রী উপজেলার কালীগঞ্জ ইউনিয়নের মাদাইখাল কালী মন্দিরে বার্ষিক মেলা যা মাদাইখালের মেলা নামে বাংলাদেশে অন্যতম একটি মেলা।
বাংলাদেশে সনাতন হিন্দুদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন,প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অবহেলা প্রভৃতি কারনে আজ বিলুপ্তির পথে প্রায় ২৩২ বছর মনান্তরে ২৬০ বছরের প্রাচীণ ঐতিহ্যবাহী মাদাইখালের মেলা। মাদাইখাল মেলার উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে মাদাইখাল কালী মন্দিরের বর্তমান সভাপতি শ্রী প্রমোদা শংকর এবং স্থানীয়দের দাবী তারা তাদের ঠাকুরদার মুখে শুনে ছিলেন,আবার ঠাকুর দাদারাও নাকি জানতেন না আসলে এর উৎপত্তিকাল সম্পর্কে। মাদাইখাল মন্দির তৈরি হওয়া নতুন দরজায় এর উৎপত্তি সাল ১২০০ বঙ্গাব্দ লেখা হলেও স্থানীয় বাসিন্দা যাদের বয়স ৮০ থেকে ৯০ এর কোঠায় এমনকি মেলার সেবায়েত ৯৬ বছর বয়সী মনাই চন্দ্রও জানেন না এর উৎপত্তি আসলে কয়শো বছর পূর্বে , তবে তাৎক্ষণিক একজন প্রহরী জানালেন, যে ফটকটি দেখতে পাচ্ছেন এ ফটকের আগে আরেকটি ফটকে এর প্রতিষ্ঠাকাল লেখা ছিল ১১৭২ বঙ্গাব্দ, সে হিসেবে এটি প্রায় ২৬০ বছর পূর্ব থেকে চলে আসছে । তবে মাদাইখাল কালীমন্দির ও সংশ্লিষ্ট মেলার উৎপত্তি সম্পর্কে যা জানা যায় তা হলো, তৎকালীন বা আদিকালের মানুষের বিশ্বাস ছিল যে, রোগ থেকে বা যেকোনো ধরনের বিপদ থেকে মুক্তির জন্য মান্নত বা মনসা করলে মানুষের ইচ্ছা পূরণ হয়। ২৬০ বছর পূর্বে মাদাইখাল নামক এই বিলের পাশের গ্রামে ‘পৌষনাথ’ নামে একজন কবিরাজ ছিলেন, তার কাছে কেউ রোগমুক্তি বা অন্য কোন সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি মাদাইখাল মন্দিরের এই স্থানটিতে মানত বা মনসা করতে বলতেন, সে বিশ্বাসে রোগ মুক্তি ও সমস্যা সমাধান হলে তারা এসে এখানে সেই মান্নতের বস্তু,কবুতর বা জন্তু দিয়ে যেতো, তখন থেকে এর প্রচলন ঘটে, এবং সে সময়ে ওই স্থানে ঠাকুরদা রসরাজ সরকার নামে এক সনাতন ধর্মালম্বী উক্ত স্থানটিতে এই কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, আর মাধাইখাল বিলের নামানুসারে এই মন্দিরের নাম মাদাইখাল কালী মন্দির এবং মেলার নামটি যুক্ত হয়ে যায়। হিমালয় থেকে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদে পঞ্জিকা অনুযায়ী তিনি দেখে ব্রহ্মপুত্র অষ্টমী স্নানের দিনে শনিবার বা মঙ্গলবার হলে সেই দিন থেকেই এখানে কালীপুজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হত।
সেই থেকে প্রচলিত বিশ্বাস শুরু হয়ে তখন থেকে এই কালী মন্দিরে পূজার্চনার পাশাপাশি প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ দিন ধরে পঞ্জিকা তিথি দেখে এ মেলা হতো। যাতে সারা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সনাতন ধর্মের লোকজন ছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল,ভুটান থেকেও সনাতন ধর্মালম্বী লোকজন আসতো, তবে এখন বাইরের দেশ থেকেও যেমন লোকজন আসে না। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকেও লোকজন আসার পরিমাণটা অনেক কমে গেছে এবং মেলায় যে পরিমাণ মানুষ হওয়া কথা এখন আর তা হয় না। এমনকি বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মেলায় বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী সম্বলিত দোকান গুলিও ক্রেতা শূন্যতায় ভুগছে,এখন আর সেটাকে মেলা হিসেবে মনে হয় না জানান স্থানীয় কয়েকজন। মূল মন্দিরের ভিতরে বিশালাকৃতির একটি কালী মূর্তি রয়েছে, যার উচ্চতা সাড়ে ১৮ ফিট বলে জানান মন্দির কমিটির সেক্রেটারি সুবোধ কুমার সরকার। এর পাশাপাশি নিচে আরো ৬ থেকে ৭ টি দুর্গা ও অন্যান্য মূর্তি রয়েছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী প্রমোদা রঞ্জন , সেক্রেটারি সুবোধ কুমার সরকার , সেবায়েত মনাই চন্দ্র ও পুরোহিত স্বপন চক্রবর্ত্তী(৫০)। কথা হলে মনাই চন্দ্র(৯৩) বলেন, মেলা ছাড়াও শনিবার, মঙ্গলবার পূজা হয়, মেলা আর আগের মত নেই, মন্দির কমিটির সেক্রেটারী সুবোধ কুমার সরকার, আগে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার এত বেশি পরিমাণ মানুষ হতো যে চোখের পলকে একজন আড়াল হলে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যেত না, মন্দিরের মাইকে মাইকিং করে নির্ধারিত স্থানে আসতে বললে তাকে পেতেও অনেক সময় লেগে যেত, আর এখন তাকালে মন্দিরে কতজন মানুষ আছে, মেলায় কতজন এসেছে তা দেখাই যাচ্ছে। এর পরিধি ও ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, সাড়ে তিন বিঘা জমির উপর এটির অবস্থান। তবে সাধক মহাগুরুর শিষ্য অবতারবাদীরা মনে করেন মাদাইখাল কালী মন্দিরটিতে এখনও দেবী জাগ্রত এবং মহামায়া ভক্তদের প্রতিবছর দেবী স্বয়ং আবির্ভুত হয়ে মনোবাসনা পুরন করেন। এখনও এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটিকে ঘিরে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে দেশে বিদেশের হাজার হাজার মহামায়া ভক্তদের আগমন ঘটবে বলে বিশ্বাস। তবে আগে ৭দিন ব্যাপী মেলা ও বলির সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ,যাত্রা,সার্কাস,পুতুল নাচ প্রদর্শনী,জুয়ার আসর জমতো। এখন যাত্রা,সার্কাস নিষিদ্ধ হওয়ার কারনে মেলায় লোকজনের সমাগমও কমে যাচ্ছে। পুর্বে মন্দিরের জমি ছাড়াও পতিত জমি থাকার কারনে পুজা ও মেলার লোকজনের সমাগম বেশী থাকতো। তবে পতিত জমি না থাকায় শুধুমাত্র মন্দিরের জায়গায় মেলা বসার কারনে ক্রমশঃ লোকজনের সমাগম কমছে। মন্দিরে পুজা ও উন্নয়নে সরকারী কোন সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সেক্রেটারি জানান, আমার জানামতে একসময় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয়েছিল।
মেলার নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে নাগেশ্বরী থানার অফিসার ইনচার্জ রেজাউল করিম রেজা বলেন, চলতি বছর মেলাটি সুন্দর ও সুষ্ঠভাবে ১২ এপ্রিল শনিবার বিকাল ৪ ঘটিকার মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেয়া হয়। তবে মেলাটি যাতে নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হয় এবং অনৈতিক কাজের অভিযোগ থাকায় সহকারী কমিশনার(ভুমি ) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল হাসান গ্রেফতারের নির্দেশ দিলে থানা পুলিশ মাদাইখাল কালী মন্দিরে পুজা ও মেলা উদযাপন কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারীকে গ্রেফতার করে পরে মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধে মুচলেকা দিলে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।
