ইশরাত জাহান চৌধুরী, মৌলভীবাজার ঃ মৌলভীবাজারে দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে জড়িয়ে নি:স্ব হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। আর রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে চলেছেন দাদন ব্যবসায়ীরা। জেলাসদর থেকে শুরু করে জেলার প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, গ্রাম, পাড়া ও মহল্লার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মধ্যবিত্ত পরিবার এবং প্রায় প্রতিটি নি¤œবিত্ত পরিবার দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অবৈধ এ দাদন ব্যবসা সম্পর্কে অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে এমনই ভয়াবহ তথ্য।
ক্ষুদ্র ঋণের নামে বিভিন্ন এনজিও এর দাদন ব্যবসার কাহিনী বেশ পুরনো। তাদেরই অনুসরণে এ ব্যবসা শুরু করে বিভিন্ন সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন সমিতি। সর্বশেষ, এনজিও এবং বিভিন্ন সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন সমিতির অনুসরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এ ব্যবসা শুরু করে বিভিন্ন ব্যক্তি।
জামানত হিসাবে জায়গা-জমি বা গাড়ী-বাড়ীর মালিকানা কাগজপত্র ও অলিখিত নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রেখে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চড়া সূদসহ নির্ধারিত দৈনিক কিস্তি পরিশোধের শর্তে বিভিণœ শ্রেণীর হকার, ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র সবজি ব্যবসায়ী, ফুটপাতের যেকোন ধরণের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও যেকোন ধরণের ক্ষুদ্র ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী, বাসার কাজের বুয়া, রিকশাচালক, ঠেলাচালক, ভ্যান চালক, অটোরিকশা ও টমটমচালক প্রভৃতি শ্রেণীর মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত লোকজনের মাঝেই এরা ক্ষুদ্র ঋণের নামে চড়া সূদের ব্যবসা পরিচালনা করে। এরকম একজন দাদন ব্যবসায়ী হলেন- বাবু। তার সূদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের নাম ‘শাহ মোস্তফা লোন’। এটির অবস্থান মৌলভীবাজার শহরের কুসুমবাগ এলাকার সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস অফিস সংলগ্ন মমতাজ ভিলা’র ৪র্থ তলায়। সাইন বোর্ড বিহীন এ প্রতিষ্ঠানটির বৈধ বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার কাছ থেকে চড়া সূদে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা শহর ও শহরতলীর সহ¯্রাধিক মানুষ। সূদের টাকা আদান-প্রদানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন লোকজনের সাথে ঝগড়া বিবাদ এ অফিসের প্রতিদিনের ঘটনা। শাহমোস্তফা লোন নামীয় প্রতিষ্ঠানটি ছাড়াও নতুনকুড়ি, মাতৃভূমি, বৃষ্টি, পাতাকুড়ি ইত্যাদি বিভিন্ন নামের শতাধিক সূদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে জেলাশহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায়। একইভাবে জেলার প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ইত্যাদি বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এ ধরনের অনেক সূদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ব্যক্তিগত সূদ ব্যবসায়ীর সংখ্যা সারা জেলায় কয়েক হাজারের বেশী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে- এসব সূদ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গ সবাই নিজেদেরকে সরকার অনুমোদিত বৈধ ব্যবসায়ী বলে দাবী করেন। অথচ, বৈধতার প্রমান দেখাতে অপারগতা জানান প্রায় সবাই।
অবৈধ এ দাদন ব্যবসা করে রাতারাতি কোটিপতি ও বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক বনছেন দাদন ব্যবসায়ীরা। অপরদিকে, দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সূদের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে সর্বশান্ত হচ্ছে শত শত পরিবার। ঋণগ্রহীতা অনেকে হচ্ছেন দেশান্তরী, অনেকে সহায়-সম্পদ বিক্রি করে হচ্ছেন পথের ফকির, অনেকে আশক্ত হয়ে পড়ছেন মাদকসেবনসহ নানা অনৈতিক কর্মকান্ডে, অনেকে জড়িয়ে পড়ছেন মাদক ব্যবসাসহ নানা অনৈতিক পেশায়। এ ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে জেলা ও উপজেলা সমাজসেবা অফিস, জেলা ও উপজেলা সমবায় অফিস, পুলিশ প্রশাসন, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করলে তারা সবাই জানান- বিষয়টি তারা খোজ নিয়ে দেখবেন এবং অবৈধ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু, এ সংবাদ পরিবেশন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন দফতরের কোন প্রকার পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *