কবি- নুরে আলম মুকতা

মৈমনসিংহ-গীতিকা আমাদের বাংলার বিশাল এক সম্পদ। এত বড় সোনার খনি যে এর ভার পরিমাপ করা কঠিন ।
বাংলা ভাষা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকা নিশ্চয়ন করে যে লেখনীগুলো তার মধ্যে মৈমনসিংহ-গীতিকা ।

প্রেম ভালোবাসা আর হৃদয় বন্ধনের আবেগ তা সার্বজনীন । এটি একটি ভাষার প্রাণচাঞ্চল্যের চাবিকাঠি। কিন্তু একটি বিষয়ে আপোষ করলে ভাষা বিপদে
পড়তে পারে তা হলো, বিদেশি ভাষা ও শব্দ আত্মীকরণ, বৈয়াকরণিক মুল সূত্রগুলো ।

সর্বোপরি মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত হওয়ার মতো বিন্যাস যিনি করবেন তার কাছে ভাষা নিরাপদ হতে হবে। এক্ষেত্রে পূর্বসূরিদের
লেখা-পড়ার সাহায্য নেয়া চমৎকার একটি কাজ। কারণ ভাষা চলমান । একটি জাতি হলো ভাষার শরীর আর ভাষা হলো ঐ শরীরের রক্তপ্রবাহের মতো ।

যে মনীষা ভাষা চর্চা করেন তিনি ভাবুক, আবেগপ্রবণ, বিজ্ঞানী এবং নিঃস্বার্থ । আমাদের ভাষার পথ প্রদর্শক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো মনীষী তাহলে আমাদের আর কিছু লাগে না ।

যিনি ভাষা হ্যান্ডেল করছেন তিনি দুর্বোধ্য কিন্তু ভাষা তাঁর কাছে বোধ্য এটি পরম কাঙ্খিত একটি বিষয় । হাশিম মাহমুদ তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ –

হাশিম মাহমুদ সম্পর্কে জানার পর আমি একটি নড়েচড়ে বসেছিলাম। আমি চমকে গিয়েছিলাম মনে করে যে, এ দূর্বোধ্য চরিত্র
বাংলার সম্পদ !

তার কদিন পরপরই দেখলাম পুরো জাতি সাদা সাদা কালা কালা বলে
চিৎকার করছে । আমি বরাবরই গান পাগল কিন্তু এত বেশি মুলধারারার বাংলা গান শুনেছি যে ঠুনকো আবেদনময় চটুল গান আমাকে টানে টানে । মাঝে মাঝে মনে হয় সেলুলয়েড ফিতার যুগ শেষ আমাদের গান শোনাও শেষ । আসলে আমাদের গানগুলো কি একদম আমাদের ?
কখনো না। এগুলো সার্বজনীন
আমাদের ব্যার্থতা হলো আমরা নতুন
প্রজন্মের জন্য কিছু করতে পারছি না ।

হাসিম মাহমুদ ভায়ের নিকট আমি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তিনি সাবলীল শালীন প্রাণ ঝঙ্কারের জায়গায় আমাদের ছেলেমেয়েদের আনতে পেরেছেন —

এবার চলুন হাশিম ভায়ের আরেকটি চমৎকার গান শুনে আসি ,

” বারো মাসে বারো ফুল রে;
ফুইট্টা থাকে ডালে-রে
এই পন্থে আইসে নাগর-
পড়তি সন্ধ্যা কালে রে!

দেখিতে সোনার, নাগর গো…
চান্দেরও সমান…।

ফুল ফুটেছে, গন্ধে সারা মন-
ফুল ফুটেছে, গন্ধে সারা মন…
তুমি আমার, কত যে আপন…
দেখা না দিলে বন্ধু কথা কইয়ো না,
“দেখা না দিলে বন্ধু-
কথা কইয়ো না

কোন বা দেশে থাকে ভোঁমরা-
কোন বাগানে বসে…।
“কোন বা ফুলের মধু খাঁইতে,
উইড়া উইড়া আসে”।

দেখিতে সোনার নাগর গো,
চান্দেরও সমান…।
“দেখিতে সোনার নাগর গো
চান্দেরও সমান”!

হাউশের পিরিতি, করিলাম আমি-
প্রেমই জীবন, প্রেমই মরণ-
এই তো জানি ….।।

ফুল ফুটেছে, গন্ধে সারা মন-
তুমি আমার, কত যে আপন!
দেখা না দিলে বন্ধু, কথা কইয়ো না…।
“দেখা না দিলে বন্ধু…
কথা কইয়ো নাহ।”

কোন বা দেশে ~ থাকে ভোঁমরা!
কোন বাগানে বসে?
কোন বা ফুলের মধু খাইতে-
উইড়া উইড়া আসে??
দেখিতে সোনার নাগর গো…,
চান্দেরও সমা..ন।
দেখিতে সোনার নাগর গো…।
চান্দেরও সমান।।

শুরুতে মৈমনসিংহ-গীতিকার অবতারণা করেছিলাম এজন্য যে হাশিম ভায়ের গানটির আখ্যানভাগ মৈমনসিংহ-গীতিকা থেকে নেয়া হয়েছে আর অবশিষ্ট গানের শরীর হাশিম ভাই নির্মাণ করেছেন ।

ভাষার কারুকার্য দেখি চলুন —

“এ পন্থে আইসে নাগর পড়তি সন্ধ্যাকালে”
নাগর আসছে যখন সন্ধ্যা সমাগত
এখানে পড়তি এর বীপরিত শব্দটি চড়তি

তাহলে শব্দ গুলোর ব্যবহার কেমন হবে
পড়তি সন্ধ্যা
চড়তি রাত

আবার দেখুন বাংলা ভাষার কী অসাধারণ
শালীনতা –

” দেখিতে সোনার নাগর গো
চান্দেরও সমান!

চাঁদ মুখ আর চন্দ্র মুখী , চাঁদ বদনী , ওরে চান্দু এগুলোর সাথে ত আমরা পরিচিত। কিন্তু নাগর যখন চাঁদের সমান হয়ে যায় তুল্য তখন আর কি বলব বলুন ?

এজন্যই অনুরোধ করি আমরা আর যাই
হই চলুন বাংলাটা জানি। মাতৃভাষা না
হলে ভাই অন্য কিছু হবে না ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *