১২ বছরেও চালু হয়নি বীর প্রতীক তারামন বিবি পাঠাগার

শেয়ার করুন

রাজীবপুর(কুড়িগ্রাম)প্রতিনিধি

বীর প্রতীক তারামন বিবির জীবদ্দশায় ২০০৯ সালের ৩ জুন উপজেলা পরিষদ চত্তরে ‘বীর প্রতীক তারামন বিবি পাঠাগার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতন বিকাশ কেন্দ্র’ নামে একটি পাঠাগার চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করে উপজেলা প্রশাসন।

একটি সেমিপাকা ঘর বরাদ্দ দিয়ে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পাঠাগারটির ভবনটি উদ্বোধন করে। এর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১২ বছর, এখন আলোর মুখ দেখেনি সেই পাঠাগার। নামসর্বস্ব একটি সাইনবোর্ড ঘরের উপর নিয়ে বইশূন্য পাঠাগারটি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুগ ধরে।

জীবদ্দশায় পাঠাগারটি দেখে যেতে পারে নি তারামন বিবি। মৃত্যু বরণ করার ৩ বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার (১ ডিসেম্বর)।স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগী,সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে অদম্য বীর প্রতীক নারী মুক্তি যোদ্ধার নামে পাঠাগারটি চালু না হওয়ায়। বিভিন্ন সময় মানববন্ধন হয়েছে পাঠাগারটি চালুর জন্য।

তারমন বিবি’র স্মৃতি রক্ষার জন্য অবিলম্বে এই পাঠাগারটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ।

রাজীবপুরে উপজেলার সরকারি মডেলে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শহিদুর রহমান বলেন, তারামন বিবি আমাদের গর্ব।তার নামে একটি পাঠাগার চালু করার উদ্যোগ নেওয়ায় আমরা খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পাঠাগারের কোন বই সরবরাহ করা হয় নি তাই চালুও হয় নি পাঠাগারটি। বিষয়টি খুব দুঃখজনক হিসেবে মন্তব্য করেন তিনি।

রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণ কমিটির সদস্য সচিব শিপন মাহমুদ বলেন, পাঠগারটিতে থাকার কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস,ঐতিহ্য,বিজ্ঞান,ধর্ম,কবিতা, গল্প ভ্রমণ,বিষয়ক নানা বই ও দৈনিক পত্রিকা।প্রতিদিন নানা বয়সী মানুষ এই পাঠাগারে এসে বই পড়ে নিজের জ্ঞানের পরিধি বিকশিত করত।কিন্তু বই না থাকায় বইপ্রেমী পাঠকরা এর সুফল পাচ্ছে না।

অদম্য নারী বীর প্রতীকের নামে উদ্বোধনকৃত এই পাঠাগারটি চালু না হওয়ায় উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বই প্রেমী পাঠকদের মনে জমেছে অভিমান। বিভিন্ন সময় পাঠাগারটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আন্দোলন করা হলেও উপজেলা প্রশাসন কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় হতাশ আন্দোলনকারীরা।

রাজীবপুর উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বেলাল সরকার বলেন,বাংলাদেশে দুই জন বীর প্রতীক নারী মুক্তিযোদ্ধার একজন তারামন বিবি।তাকে সম্মানিত করার জন্যই তার নামে এই পাঠাগারটি করার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়।কিন্তু সেটি আর বাস্তব রুপ পেলো না। শুধু সাইনবোর্ড ও একটি ঘর বরাদ্দ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে।

তারামন বিবি’র ছেলে আবু তাহেরের সাথে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মা বেঁচে থাকতে পাঠাগারটি উদ্বোধন হয়েছিল কিন্তু পাঠাগারটি চালু হওয়া দেখে যেতে পারে নি’। মায়ের মৃত্যুর ৩ বছর হয়েছে এখনও পাঠাগারটি চালু হল না। তাহলে কি কোনদিন চালু হবে না এই পাঠাগার ? যদি পাঠাগারটিতে বই না দেওয়া হয় তাহলে সাইনবোর্ডটি খুলে রাখার অনুরোধ করনে তিনি।

পাঠাগারটির সহ সভাপতি রাজীবপুর সরকারী ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সবুর ফারুকী বলেন,পাঠাগারটিতে বই থাকার কথা অথচ একটি বইও নেই। তারামন বিবির জন্মস্থানে তার নামে একটি নামসর্বস্ব পাঠাগার করে রাখা খুবই লজ্জাজনক। এটি চালু করার ব্যাপারে অনেকবার প্রশাসনকে বলা হয়েছে কিন্তু কার্যকরী কোন উদ্যোগ নেওয়া হয় নি।তিনি আরও বলেন ডিসেম্বর মাস বিজয়ের মাস এই বিজয়ের মাসেই উপজেলা প্রশাসনের উচিত এই পাঠাগারটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া।

পাঠাগারটির উদ্বোধক ও রাজীবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো বলেন,এই পাঠাগারটির ভবন উদ্ধোধন করা হয়েছিল কিন্তু তারপর আর কোন অগ্রগতি হয় নি।উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে এটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও নানা জটিলতায় কালক্ষেপন হচ্ছে।তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন অতিদ্রুত উপজেলা প্রশাসন উদ্যোগ নিয়ে এটি চালু করবেন।

রাজীবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাঠাগারের সভাপতি উত্তম চক্রবর্তী বলেন,পাঠাগারটি জন্য কিছু বই আছে।আসবাবপত্র না থাকায় পাঠাগারটি চালু করা যাচ্ছে না। তিনি এটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।তিনি আরও জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তারা কবরে ফুলের শ্রদ্ধা ও রুহের মাগফেরাত কামনায় মোনাজাত করা হবে।

তারামন বিবি ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলার কোদালকাটি ইউনিয়নের শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন । মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে অনেকটা আড়ালেই থেকে যান এই নারী মুক্তিযোদ্ধা।১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যাপক বিমল কান্তি দে,কুড়িগ্রামের সাংবাদিক পরিমল মজুমদার এবং রাজীবপুর উপজেলার অধ্যপক আব্দুস সবুর ফারুকী খুঁজে বের করেন এই নারী মুক্তিযোদ্ধা কে।ওই বছরই সরকার ঘোষিত বীর প্রতীক খেতাব গ্রহণ করেন তিনি।

২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর ৬১ বছর বয়সে কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার কাচারী পাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে মৃত্যু বরণ করেন অদম্য সাহসী এই নারী বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।