নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি |
কুড়িগ্রাম জেলার কচাকাটা থানাকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ঘোষণার দাবিতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু-এর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে এলাকাবাসী।
গত ১০ মে সরকারি সফরে কুড়িগ্রামে এসে মন্ত্রী জেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন। সফরকালে তিনি প্রস্তাবিত কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্থান পরিদর্শন করেন এবং পরে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। বিকেলে ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাব-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন। এ সময় কচাকাটা থানাকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলা ঘোষণার দাবিতে কচাকাটা থানার সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু মন্ত্রীর হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, কচাকাটা একটি প্রাচীন, জনবহুল ও ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে এটি প্রশাসনিক থানা হিসেবে পরিচালিত হলেও আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার দিক থেকে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলার সব যোগ্যতা অর্জন করেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দুধকুমার, গঙ্গাধার, সংকোষ ও ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা দ্বারা বেষ্টিত কচাকাটা থানার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। জেলা সদর থেকে নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী হয়ে সড়কপথে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে কচাকাটায় পৌঁছাতে হয়। ফলে সাধারণ মানুষের প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা গ্রহণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
কচাকাটা থানার আওতাধীন পূর্ণাঙ্গ পাঁচটি ইউনিয়ন হলো— কচাকাটা, বলদিয়া, বল্লভের খাস, কেদার ও মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন নারায়ণপুর। এছাড়াও কালীগঞ্জ, বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ী ও রায়গঞ্জ ইউনিয়নের একাংশ এ থানার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এলাকায় কৃষি, সমাজসেবা, প্রাণিসম্পদ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখানে রয়েছে ৪টি কলেজ, ১৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৪টি মাদ্রাসা ও ৭৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রায় ৪ লাখ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাজের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় প্রসূতি মা, শিশু ও বৃদ্ধ রোগীরা দ্রুত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জরুরি চিকিৎসার জন্য স্থানীয়দের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ৩০ কিলোমিটার, নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে অনেক সময় রোগীদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করা হয়।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করে, কচাকাটাকে উপজেলা ঘোষণা করা হলে সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে। ভারতের আসাম রাজ্যের সঙ্গে সীমান্তবর্তী হওয়ায় এ অঞ্চলে স্থলবন্দর ও সীমান্ত বাণিজ্যেরও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রস্তাবিত দুধকুমার নদীর ওপর সেতু নির্মাণ হলে কচাকাটার সঙ্গে জেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার কমে আসবে। এছাড়া সম্ভাব্য ভুটান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে কচাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ফলে এলাকাটিকে উপজেলা হিসেবে উন্নীত করা হলে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গণমাধ্যমকর্মী আব্দুল কুদ্দুস চঞ্চল ও মনিরুল ইসলাম মিলন জানান, ২০১১ সাল থেকে কচাকাটাকে উপজেলা ঘোষণার দাবিতে মানববন্ধন, গণসংযোগ, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। অবহেলিত এ অঞ্চলের মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত কচাকাটাকে উপজেলা ঘোষণা জরুরি বলে তারা মত দেন।
এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, “দীর্ঘদিনের জনদাবির প্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে কচাকাটা প্রশাসনিক থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এখনো এটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হয়নি। দুর্গম সীমান্ত ও চরাঞ্চলের মানুষের নাগরিক সেবা সহজ করতে এবং উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে কচাকাটাকে দ্রুত উপজেলা ঘোষণা করা সময়ের দাবি।”
