রংপুর অফিস.
শাহ আলম। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কালে গ্রামে বাড়ি তার। ফাজিল পাস করে ১৯৯২ সালে যোগ দেন এলাকার নীলকণ্ঠ স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে। তার সম্পদ বলতে ভিটেমাটির ৬ শতক জমি। সেখানে স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন। কিন্তু সরকার তাকে দেয় সাড়ে ১২ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে সংসারের কিছুই হয় না তার। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একটানা ক্লাস নিয়ে সেখান থেকেই চলে যান দোকানে। সেই দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। কোনমতে খেয়ে না খেয়ে সংসার চলে তার। নীলফামারী সদরের ইটাখোলার কালিয়ালখাতার বয়োবৃদ্ধ সৈয়দ আক্কাস আলী। ১৯৮৫ সালে তিনি ইটাখোলা কাউন্সিল স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেই থেকেই বিনাশ্রম। দুই ছেলেকে নিয়ে দুর্বিষহ কষ্টে কাটছে জীবন তার। অর্থের অভাবে বড় ছেলেকে ভালো কোথাও ভর্তি করাতে পারেননি। কবিরাজি আর ইমামতির টাকা দিয়ে কষ্টে জীবন চলে তার। রংপুরের কাউনিয়ার টেপামধুপুরের রাজিব গ্রামের নুর মোহাম্মদ। ফাজিল পাস করার পর ১৯৯৪ সালে মোলাটারী আদর্শ স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। সম্পদ বলতে ৭ শতক ভিটেমাটি আছে তার। মাদরাসা থেকে যা পান তা দিয়ে চা খাওয়াই হয় না। গণশিক্ষা এবং ইমামতি করে অতি কষ্টে সংসার চলাচ্ছেন তিনি। শাহ আলম,নুরুল আবছার দুলাল,মজনু মন্ডল, গোলাম আজম,সৈয়দ আলী, সাইফুল ইসলাম, আক্কাস আলী কিংবা নুর মোহাম্মদই নয়। সারাদেশে ৬ হাজার ৬৪৮টি স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার ৩৪ হাজার ২৪০ জন শিক্ষক পরিবারে এখন ঘনঘোর অন্ধকার। তারা না পারছেন সইতে। না পারছেন বইতে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে জীবনযুদ্ধে পরাজয়ের গানি তাদের। কিন্তু এ সংক্রান্ত খসরা নীতিমালা শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ৬ বছর থেকে ফাইলবন্দি হয়ে আছে।
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতি সূত্রে প্রকাশ, ১৯৮৪ সালে সারা দেশে ১৮ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাকে রেজিস্ট্রেশন দেয় সরকার। বর্তমানে সারাদেশে ৬ হাজার ৮৪৮টি মাদরাসা চালু আছে। যেখানে ৩২ হাজার ২৪০ জন শিক্ষক শিক্ষিকা পাঠদান করে আসছেন। এরমধ্যে ১৯৯৪ সালে ১ হাজার ৫১৯টি মাদরাসাকে এমপিওভুক্ত করে সারা দেশে ৬ হাজার ৭৬ জন শিক্ষক শিক্ষিকাকে সরকারিভাবে মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা প্রদান করে আসছে। মাসিক ৫০০ টাকা উলেখ থাকলেও তা আবার তিন মাস পর পর দেয়া হয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারি হতে তা বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা দেয়া হচ্ছে। সেই টাকা তুলতেও ভুগতে হয়। টাকা পান আর না পান তবুও শিক্ষকরা স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোতে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পাঠদান করে আসছেন। খেয়ে না খেয়ে। প্রথম শ্রেণি হতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন।
সমিতি সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন থেকে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক-শিক্ষিকারা জাতীয় স্কেলে বেতন ভাতা প্রদান, প্রথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান ও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়ন করার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কেউই তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। ফলে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অন্যকে শিক্ষা দিলেও তারা সমাজের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েছেন। তারা সামাজিকভাবে বিপন্ন।
কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীর খামার আন্ধারিঝাড় এলাকার সিংঝাড় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসার শিক্ষক আছর উদ্দিন জানান, মাদরাসা থেকে ফাজিল পাস করে ১৯৮৪ সালে মাদরাসায় যোগ দিয়ে পাঠদান করে আসছি। ভিটোমাটির ১৫ শতাংশ জমিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ৪ ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রথম ছেলেকে পড়ালেখা করাতে পারিনি। সংসার চালাতে গিয়ে তাকে গার্মেন্টসে কাজ করতে পাঠিয়েছি। নিজে বাড়ি বাড়ি প্রাইভেট পড়িয়ে জীবন যাপন করছি। এভাবে খেয়ে না খেয়ে অতিকষ্টে ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছি। এক ছেলে কামিল ফাইনাল পরীক্ষা দিবে। আরেক ছেলে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। একমাত্র মেয়েটাও এবার ফাজিল পরীক্ষা দিবে। তারাও অনেক কষ্ট করে পড়াশুনা করছে। তাদের বই খাতা কলম ড্রেস কিনে দিতে পারি না। কতোদিন তাদের একটা পোশাক কিনে দিতে পারিনি। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন তিনবেলা তাদের ভাগ্যে খাবারও জোটে না। পিতা হিসেবে বড় অসহায় বোধ করি। সরকার যদি জাতীয় বেতেন স্কেলে প্রাইমারি শিক্ষকদের মতো আমাদের জাতীয়করণ করতো এবং বেতন দিতো তাহলে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পেতাম।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার হরগবিন্দ এলাকার মোহাম্মদনীয় স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সৈয়দ আলী জানান, কামিল পাস করে ১৯৮৫ সালে এখানে যোগদান করি। সেই থেকেই আমার জীবনের অভিশপ্ত জীবনের সূত্রপাত। ৫ ছেলেমেয়েকে নিয়ে কি যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি তা বোঝাতে পারবো না। প্রাইভেট পড়িয়ে ইমামতি করিয়ে সামান্য আয় দিয়ে অতিকষ্টে খেয়ে না খেয়ে জীবন চলছে আমার। খেয়ে না খেয়ে অন্যের ধার করা বই দিয়েই বড় মেয়ে এমএ পাস করেছে। একটা ছেলে বিবিএ পড়ছে। আরেক ছেলে পলিট্রেকনিক্যালে পড়ছে। একটা মেয়ে দশম শ্রেণিতে আর ছোট ছেলেটা পড়ে ওয়ানে। অর্থের অভাবে মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে তা কেবল আমি জানি। তিনি জানান, সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। কখন সরকার প্রধান আমাদের দিকে একটু নজর দিবেন। আমাদের না খেয়ে থাকার দিনের অবসান হবে। আমরা চাই প্রাইমারি শিক্ষকদের মতো আমাদের বেতন ভাতা দেয়া হোক। সরকারিকরণ করা হোক।
এদিকে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক সমিতি রংপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য মাওলানা নুরুল আফসার দুলাল জানান, সারা দেশের মতো রংপুর জেলায় ৩৬০টি মাদরাসা রয়েছে। যার মধ্যে রংপুর জেলায় ২৯টি মাদরাসা অনুদানভুক্ত। তিনি আরও জানান, তারা বৈষম্যের শিকার, কারণ তাদের মতো সংযুক্ত দাখিল, আলিম, ফাযিল, কামীল মাদরাসাগুলোতে ও ইবতেদায়ী রয়েছে। শুধু আমরা প্রাইমারি স্কুলের মতো প্রথম শ্রেণি হতে পঞ্চম শ্রেণি হতে পড়াই বলে আমাদের মাদরাসাগুলোতে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা বলে। কিন্তু উভয় মাদরাসায় একই রকম বই ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। মান ও একই পরীক্ষার পদ্ধতি সকল নিয়ম কানুন একই। শুধু বেতন ভাতার ক্ষেত্রে পার্থক্য। কারণ তারা পায় জাতীয় স্কেলে বেতন আর আমরা পাই মাসিক ১০০০ টাকা বেতন। একই মাদরাসা কিন্তু বেতনের ক্ষেত্রে নিয়ম দুই প্রকার এটা অমানবিবক। অবিলম্বে এসব মাদরাসা প্রাইমারি স্কুলের মতো জাতীয়করণে দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষক ঐক্য পরিষদ কেন্দ্রীয় নেতা গোলাম আজম ও শামছুল আলম জানান, বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক মঞ্জুরি নিয়ে দেশে প্রায় আঠার হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সরকারি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে প্রায় ১১ হাজার ১৫২টি ইবতেদায়ী মাদরাসা বিলুপ্ত বর্তমানে সরকারি হিসাব মতে ৬ হাজার ৮৪৮টি মাদরাসা চালু আছে। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর এসব ইবতেদায়ী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বয়স ৩০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা বিনা বেতনে চাকরি করে মারা গেছেন। অনেকে বিনা বেতনে চাকরি করে শূন্য হাতে অবসরে গেছেন তার কোনো ইয়াত্তা নেই। আমাদের চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে আমরা জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কাফনের কাপড় পরে মানববন্ধন করেছি। সারাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু অজানা কারণে আমাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। ফলে প্রায় ৩৪ হাজার শিক্ষক পরিবারের দেড় লাখ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে আছে। তারা সমাজের মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।
সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১১ মে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষা আধুনিকায়নে শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির নির্দেশনা প্রদান করলে শিক্ষামন্ত্রী ইবতেদায়ী মাদরাসার জন্য পৃথক নীতিমালা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। এরপর একটি খসড়া নীতিমালা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ৬ বছর ধরে অজ্ঞাত কারণে সেই খসড়া নীতিমালা হিমাগারে ফাইলবন্দি আছে।
সূত্র জানায়, এই নীতিমালা হিমাগারে পড়ালেখা থাকলেও জাতীয় শিক্ষানীতির ৬৩ ধারায় ইবতেদায়ী শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষকদের মর্যাদা প্রদানের কথা স্পষ্টভাবে উলেখ আছে। সূত্র জানায়, দেশে বর্তমান শিক্ষার হার প্রায় শতকরা ৬৫%। শিক্ষার হার বৃদ্ধির পেছনে ইবতেদায়ী মাদরাসা শিক্ষকদের ভূমিকা রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, প্রতি বছর সরকারি বাজেটে শিক্ষ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়। অথচ ইবতেদায়ী মাদরাসার কর্মরত ২৬ হাজার ৬৪৫ জন শিক্ষক সরকারি সুযোগ-সুবিধার কোনো অংশ পায় না। ১৯৯৪ সালে রেজিস্ট্রার প্রাইমারি ও ইবতেদায়ী মাদরাসা একই পরিপত্রের আলোকে বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল। অথচ ২৬ হাজার ২৯৫টি রেজিস্ট্রার প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সকল শিক্ষককে ২০১৩ সালে সরকারি করা হয় কিন্তু ইবতেদায়ী ৬ হাজার ৮৪৮টি মাদরাসা সরকারি হওয়া থেকে বাদ পড়েছে। ইবতেদায়ী মাদরাসাগুলোকে মাধ্যমিক অধিদফতরে স্থানান্তর করায় এই বাদ পড়ার মূল কারণ বলে জানা গেছে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ জানান, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫ (খ) তে উলেখ আছে কর্মের অধিকার অর্থাৎ কাজের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরি প্রদান করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব ও আমাদের মৌলিক অধিকার। অথচ ইবতেদায়ী মাদরাসায় কর্মরত শিক্ষকগণ তাদের মৌলিক অধিকার হতে দীর্ঘ ৩০ (ত্রিশ) বছর পর্যন্ত বঞ্চিত হয়ে আছে। এটার সুরাহা হওয়া উচিৎ। খসরা নীতিমালাটি চূড়ান্ত করে জাতীয় স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে সকল ইবতেদায়ী মাদরাসা ও শিক্ষকগণকে পূর্ণ মর্যাদা দিলে এসব শিক্ষক পরিবারের অভিশাপের দিন কেটে যাবে।
