মনজুরুল ইসলাম সাংবাদিক
রাজনীতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের কণ্ঠ রোধ করার জন্য নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব জনগণের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা করা; রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কাউকে অধিকারবঞ্চিত করা নয়। অথচ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা বারবার সামনে আসে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় প্রতিপক্ষের প্রতি আচরণ। একসময় যারা ক্ষমতার দাপটে বিরোধীদের কোণঠাসা করে, সময়ের পরিবর্তনে তারাই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় পড়ে। এই চক্রের কোনো স্থায়ী বিজয়ী নেই; শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং সাধারণ মানুষ।
রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে কারও নাগরিক অধিকার সংকুচিত করা, আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে তাকে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। অপরাধ করলে বিচার হবে, দুর্নীতি করলে তদন্ত হবে, ক্ষমতার অপব্যবহার করলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে—কিন্তু এসব কিছুই হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
সংবিধানের ঊর্ধ্বে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতা এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত। ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক, বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, যদিও এসব অধিকারের ক্ষেত্রে সংবিধানে নির্ধারিত যুক্তিসংগত আইনগত সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য। সূত্র: বাংলাদেশ বিচার বিভাগের মৌলিক অধিকারবিষয়ক তথ্য।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকার রক্ষা করা নয়; রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয়, সংখ্যালঘু মতের অনুসারী কিংবা বিরোধী দলের সমর্থকের অধিকারও আইন অনুযায়ী সুরক্ষিত রাখা। কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক বিশ্বাস সরকারের পছন্দের সঙ্গে মিলবে কি না, সেটি তার নাগরিক মর্যাদা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অপরাধের বিচার এক বিষয় নয়। কেউ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে হত্যা, সহিংসতা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু শুধু দলীয় পরিচয়, অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, বিরোধী মত কিংবা কোনো নির্দিষ্ট স্লোগানের কারণে কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়া ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক জনমত কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তির ইচ্ছা নয়।
সমসাময়িক বাংলাদেশ: অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্ন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হলেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সংস্কৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অধিকার ও নির্বিচার গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একটি সমাবেশে অংশ নেওয়া প্রায় ২৯০ জনকে আটক করার ঘটনা তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সমাবেশটি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের গোপন সভা—এমন অভিযোগ করেছিলেন ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের সদস্যরা। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ জনকে আদালত রিমান্ডে পাঠানোর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনের বিবরণ; প্রতিটি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা বা আইনগত দায় নির্ধারণের বিকল্প নয়। সূত্র: Human Rights Watch, ৫ অক্টোবর ২০২৬।
এই ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ কি নিজেই গ্রেপ্তার বা শাস্তির যথেষ্ট ভিত্তি হতে পারে? উত্তর খুঁজতে হলে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তার পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে এবং আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সরকারের রয়েছে। একই সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালনের নামে নাগরিকের বৈধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে অযৌক্তিকভাবে সংকুচিত না করাও জরুরি। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যক্তিভেদে ন্যায়সংগত আচরণ—এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন।
প্রতিহিংসার রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নিজের কাছেই ফিরে আসে
প্রবাদ আছে, ‘ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়।’ রাজনৈতিক বাস্তবতায় এর তাৎপর্য আরও গভীর। আজ যে পক্ষ ক্ষমতাবান, আগামীকাল তার অবস্থান বদলাতে পারে। আজ যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য প্রশাসনিক ক্ষমতা, মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা সামাজিক বয়কটের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে একই কৌশল অন্য কোনো পক্ষের হাতে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে প্রতিহিংসার পরিণতি শুধু ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সাধারণ নাগরিকের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। কেউ নিজের মত প্রকাশে সতর্ক হয়ে পড়ে, কেউ রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করতে চায়, কেউ আবার হয়রানির আশঙ্কায় বৈধ দাবি তুলতেও পিছিয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক নেতাদের দ্বন্দ্বের বাইরে থাকা একজন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, চাকরিজীবী কিংবা সাংবাদিকও যদি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য বা হয়রানির শঙ্কায় থাকেন, তবে নাগরিক স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
প্রতিশোধের রাজনীতির আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো—এটি অপরাধের বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অস্ত্রে পরিণত করতে পারে। প্রকৃত অপরাধীর বিচার তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কারণ মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করে, ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে ন্যায়বিচারের স্বার্থে, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে। ফলে জবাবদিহির প্রয়োজনীয় উদ্যোগও জনআস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়
রাষ্ট্রের প্রশাসন, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। এগুলোর দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষকে দমন করা নয়; বরং আইন অনুযায়ী সবার অধিকার রক্ষা করা। কোনো কর্মকর্তা যদি রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নাগরিকের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অনিয়মের প্রশ্ন নয়—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও।
অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সাধারণ কর্মী কিংবা বিরোধী মতের মানুষ—সবার জন্য একই নীতির প্রয়োগই আইনের শাসনের মূল পরীক্ষা।
একইভাবে, অতীতে ক্ষমতায় থাকা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিচারের নামে অন্যায়ভাবে কাউকে শাস্তি দেওয়া, তার পরিবারকে হয়রানি করা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার বৈধ সম্পদ, পেশা বা সামাজিক মর্যাদার ওপর আঘাত করা গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যক্তিগত দায় এবং পারিবারিক বা দলীয় পরিচয়কে এক করে দেখলে ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের শক্তি কতজনকে আটক করা হলো, কতজনকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা গেল কিংবা কতজন বিরোধীকে নীরব করা গেল—তা দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতা বোঝা যায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আইন সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না এবং দুর্বল নাগরিকও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন কি না, তা দিয়ে।
গণতন্ত্রে বিরোধী মত কোনো অপরাধ নয়
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, এখানে সবাই একমত হবেন না। সরকার তার নীতি বাস্তবায়ন করবে, বিরোধী দল তার সমালোচনা করবে, নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তুলবে এবং সংবাদমাধ্যম ক্ষমতার কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করবে। এই ভিন্নমত কখনো তীব্র হতে পারে, কখনো রাজনৈতিক বিতর্ক উত্তপ্ত হতে পারে। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনসম্মত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
অবশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অর্থ সহিংসতায় উসকানি, অপরাধ সংঘটন কিংবা অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের অবাধ অনুমতি নয়। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ও বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া হতে হবে সুনির্দিষ্ট আইন, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত শুনানির ভিত্তিতে। সমালোচনা আর অপরাধ, রাজনৈতিক বিরোধিতা আর সহিংসতা—এই পার্থক্য বজায় রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো সাংবাদিক সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অংশ ধরে নেওয়া কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য প্রকাশ করলেই তাকে সেই দলের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত করে। সংবাদমাধ্যমের কাজ তথ্য যাচাই, জনস্বার্থের প্রশ্ন তোলা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা। ভুল বা মানহানিকর তথ্য প্রকাশের অভিযোগ থাকলে তারও আইনগত প্রতিকার রয়েছে; কিন্তু ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে হয়রানি হলে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী।
প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন ন্যায়বিচার ও সংস্কার
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু বক্তৃতায় সহনশীলতার কথা বললে চলবে না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে তার প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রথমত, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, গ্রেপ্তার, আটক, মামলা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। প্রত্যেক অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাগত নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের অপরাধের দায় এড়ানোর সুযোগ না দিয়ে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা বেআইনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রবণতা পরিহার করতে হবে।
পঞ্চমত, নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্ত, আদালতের স্বাধীনতা, মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম—এসব প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে।
সবশেষে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক ঐকমত্য প্রয়োজন: ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, প্রতিপক্ষের আইনগত অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। কারণ আজকের বিরোধী দল আগামী দিনের সরকার হতে পারে, আর আজকের ক্ষমতাসীন দলও ভবিষ্যতে বিরোধী দলে যেতে পারে। রাষ্ট্রের নিয়ম যদি ব্যক্তির বদলে নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তবেই ক্ষমতার পরিবর্তন নাগরিকের জন্য আতঙ্কের কারণ হবে না।
শেষ কথা: ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, রাষ্ট্র ও নাগরিকের অধিকার স্থায়ী হওয়ার কথা
রাজনীতির উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করা নয়; জনগণের আস্থা অর্জন করা। রাজনৈতিক বিজয় তখনই অর্থবহ হয়, যখন বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের অধিকারও রক্ষা করতে পারে। যে রাষ্ট্রে মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, সেখানে স্থিতিশীলতা কেবল বাহ্যিক হতে পারে; ভেতরে ভেতরে জমতে থাকে ক্ষোভ, অবিশ্বাস ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা।
ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ক্ষমতার অপব্যবহার দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না। প্রতিশোধের মাধ্যমে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও তা ভবিষ্যতের জন্য একই ধরনের প্রতিশোধের দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। আজ অন্যায়ের পক্ষে নীরব থাকা মানে আগামীকাল নিজের অধিকার রক্ষার নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করা।
তাই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলছি, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেকে ন্যায়বিচার পাবেন? নাকি এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করছি, যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যাবে ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা?
মনে রাখতে হবে, ইটের জবাবে পাটকেল ছোড়ার রাজনীতি চলতে থাকলে একসময় ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবার ঘর। প্রতিশোধের পরিবর্তে আইনের শাসন, প্রতিপক্ষ দমনের পরিবর্তে জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে নাগরিক মর্যাদাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়—রাষ্ট্র সব নাগরিকের। এই সত্যকে রাজনৈতিক আচরণের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরবে এবং নাগরিক অধিকার ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে না।
কারণ, ক্ষমতা বদলায়; কিন্তু অন্যায়ের দৃষ্টান্ত থেকে যায়। আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—নিজের প্রতিপক্ষের অধিকারও সমান নিষ্ঠায় রক্ষা করতে পারা।
**লেখক,সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক, সমাজ সংস্কারক ও মহাকাল গবেষক**

