— হুমায়ুন কবির সুর্য
সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা, এক ধরনের নীরব যুদ্ধ। সমাজের অসঙ্গতি, অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কলম ধরা মানুষগুলো বাইরে থেকে যতটা দৃঢ় দেখায়, ভেতরে তারা ততটাই ক্ষত-বিক্ষত। দিনের পর দিন ছুটে চলা, তথ্যের পেছনে নির্ঘুম সময় ব্যয় করা, সত্য উদঘাটনের জন্য সম্পর্ক বিসর্জন দেওয়া—এসবই যেন একজন প্রকৃত সাংবাদিকের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
একজন সৎ সাংবাদিকের জীবনকে বাইরে থেকে যতটা গৌরবময় মনে হয়, বাস্তবে তার ভেতরে ততটাই নিঃসঙ্গতা বাসা বাঁধে। পরিবার ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়, আত্মীয়স্বজন ক্ষুব্ধ হয়, বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে ওঠে। কারণ সত্য প্রকাশের পথে আপসের সুযোগ কম। আত্মীয়ের অনুরোধে অন্যায়ের খবর চাপা না দেওয়া, পরিচিত প্রশাসনিক কর্মকর্তার সুবিধাবাদী অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা—এসব সিদ্ধান্তই একজন সাংবাদিককে ধীরে ধীরে “অপ্রিয়” মানুষে পরিণত করে।
তবুও একজন আদর্শ সাংবাদিক কেন থেমে যান না?
কারণ তিনি জানেন, সমাজে সত্য বলার মানুষ কমে গেলে অন্ধকার আরও দ্রুত নেমে আসে। একটি সঠিক সংবাদ কখনো কখনো শত মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে পারে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দুর্নীতির পাহাড় কাঁপিয়ে দিতে পারে। আর একটি সাহসী কলম ক্ষমতার অপব্যবহারের মুখোশ খুলে দিতে পারে।
কিন্তু এই সাহসিকতার মূল্যও কম নয়।
রাতভর নিউজ তৈরি করে ঘরে ফিরে যখন একজন সাংবাদিক জানতে পারেন বাসায় বাজার নেই, সন্তানের স্কুলের বেতন বাকি, কিংবা পরিবারের চাহিদা পূরণ করার মতো সামর্থ্য নেই—তখন তার ভেতরে যে অসহায়তা জন্ম নেয়, তা সমাজ খুব কমই বুঝতে চায়। মানুষ সংবাদ দেখে, প্রতিবেদন পড়ে; কিন্তু সেই প্রতিবেদনের পেছনের মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রামগুলো অদৃশ্যই থেকে যায়।
বর্তমান সময়ে সাংবাদিকতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। এখন অনেকেই সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত প্রভাব, ক্ষমতা বা অর্থ অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে। কেউ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শক্তিশালী হচ্ছেন, কেউ প্রশাসনিক যোগাযোগকে পুঁজি করছেন, কেউ আবার সংবাদপত্রের পরিচয় ব্যবহার করে অন্য ব্যবসায় সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত ও আদর্শবাদী সাংবাদিকরা অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সমাজ এখন ধীরে ধীরে “ভালো মানুষ” নয়, “ক্ষমতাবান মানুষ”কে বেশি মূল্য দিচ্ছে। সততা নয়, যোগাযোগ এখন অনেকের মূল যোগ্যতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় সৎ সাংবাদিকরা প্রায়শই নিজেদের ব্যর্থ মনে করেন। অথচ সমাজের বিবেক হিসেবে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
একসময় সংবাদপত্র ও টেলিভিশন ছিল সাংবাদিকদের হাতের শক্তিশালী মাধ্যম। এখন সেই জায়গাগুলোর বড় অংশ চলে গেছে ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, আর সাংবাদিকতার মূল আদর্শ হারিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই পরিস্থিতি অনেক প্রবীণ ও আদর্শবাদী সাংবাদিকের মনে হতাশা তৈরি করেছে।
তবুও আশার জায়গা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
কারণ ইতিহাস বলে—সত্যকে দীর্ঘদিন চাপা রাখা যায় না। সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার সময়েও কিছু মানুষ কলম হাতে দাঁড়িয়ে থাকেন বলেই মানবতা পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। একজন সৎ সাংবাদিক হয়তো অর্থে ধনী নন, ক্ষমতায় প্রভাবশালী নন; কিন্তু তার আত্মতৃপ্তি, নৈতিক সাহস এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা তাকে আলাদা মর্যাদা দেয়।
সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—এটি কেবল সংবাদ পরিবেশন নয়, এটি মানুষের বিবেক জাগিয়ে তোলার দায়িত্বও বহন করে।
আজকের এই কঠিন সময়ে প্রয়োজন নতুন করে সাংবাদিকতার আত্মসমালোচনা, আদর্শের পুনর্জাগরণ এবং তরুণ সাংবাদিকদের মধ্যে নৈতিকতার চর্চা। কারণ একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন তার সংবাদমাধ্যম সত্য বলার সাহস রাখে।
সিদ্ধান্ত তাই এখনো সাংবাদিকের হাতেই—তিনি কি আপসের নিরাপদ পথ বেছে নেবেন, নাকি কষ্টের হলেও সত্যের পথে অবিচল থাকবেন।
লেখক,সাংবাদিক, সমসাময়িক প্রাবন্ধিক সমাজ সেবক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো পড়ুন