বিপুল কুমার রায়,স্টাফ রিপোর্টার
নাগেশ্বরীর গোসাইবাড়ি শিব মন্দিরে অষ্টপ্রহর মহানাম যজ্ঞ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মন্দির পরিষ্কার করতে গেলে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিককে গাঁজাখোর বলে গালিগালাজ করায় সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বীদের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপন। ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ ব্যাপারীহাট গোসাইবাড়ি প্রাচীন শিবমন্দির প্রাঙ্গনে। ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানাগেছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন কুড়িগ্রামসহ বৃহত্তর রংপুরের ফকির ও সন্ন্যাসীরা। যা ইতিহাসে ফকির সন্ন্যাসী বিদ্রোহ নামে খ্যাত। এই সংগ্রামে ফকিরদের নেতৃত্বে ছিলেন ফকির মজনু শাহ বুরহান আর সন্ন্যাসীদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভবানী পাঠক। ভবানী পাঠক ছিলেন রংপুরের পীরগাছা এলাকার মন্থনার জমিদার জয়দুর্গা দেবী চৌধুরানীর নায়েব। তার বাড়ি ছিল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার পাঠকপাড়ায়। তিনি বিভিন্ন এলাকায় শিবমন্দির নামে মঠ তৈরি করেন।এই মঠগুলোতে অবস্থান নিয়ে সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করতেন। সংস্কারের অভাবে কালের সাক্ষী সেই মঠগুলো কোনো রকমে টিকে থাকলেও নেই নিয়মিত পুজার্চনা । পলাশী যুদ্ধের পর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সুযোগে ফকির ও সন্ন্যাসীরা বিদ্রোহী হয়ে স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।১৭৭০ সালে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এই দুর্ভিক্ষের শিকার ভূমিহীন ও নিরন্ন কৃষকদের সমর্থন পান বিদ্রোহীরা। এ সময় বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে ভূমিহীন ও নিরন্ন কৃষকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এজন্য ১৭৭০ থেকে ১৭৭২ সালের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় শিবমন্দির নামে মঠ নির্মাণ করেছিলেন ভবানী পাঠক। সেই কারনে এই শিব মন্দির গুলো ভবানী পাঠকের মঠ নামে পরিচিত।
ভবানী পাঠকের নির্মিত মঠগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ ব্যাপারীহাট গোসাইবাড়ি শিবমন্দির, কাচারি পয়রাডাঙ্গা এলাকায় কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী সড়কের দু’পাশে নির্মিত দুটি শিবমন্দির, কামাক্ষা মাতা ঠাকুরানী মন্দির, কচাকাটা থানার মাদারগঞ্জ কৃষ্ণগীর সন্ন্যাসীর শিব মন্দির ও নাগেশ্বরী বাঁশেরতল শিবমন্দির,
উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেণী এলাকার দোল মন্দির ও শিবমন্দির এবং ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা এলাকার শিবমন্দির।
জানাগেছে বৃটিশ পুর্ববর্তী ১৭৭০ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত সময়ে গয়াকাশি বৃন্দাবন হতে আধ্যাত্মিক সাধক সন্ন্যাসীর ও গোসাইরা প্রতিবছর পায়ে হেটে আসামের নীলাচল পর্বতে সতির একান্নপীঠের অন্যতম মহামায়া কামাখ্যা মন্দিরে অম্বুসাচীর মেলায় যাওয়ার সময় এই গোসাইবাড়ি শিবমন্দিরে অবস্থান করত। তৎকালীন ২৪ পরগনার গয়বাড়ির মহারাজা শ্রীশ চন্দ্র নন্দী এসব মন্দির গুলো পরিচালনার জন্য মন্দিরের নামে জমি রেকর্ড করে দেন। মন্দিরের নিজস্ব জমির ফসল হতে মন্দিরে আগত পুন্যার্থী ও ভক্তদের খাবার,প্রসাদ বিতরণ ও মন্দিরের পুজারী/সেবায়েতের দক্ষিণা প্রদান করা হত।নাগেশ্বরী উপজেলার কাছাড়ী পয়রাডাঙ্গা,বাশের তল শিব মন্দির দুটি রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে এবং মাদারগঞ্জ কৃষ্ণগীর সন্যাসীর মঠ বা শিব মন্দির নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে দক্ষিণ ব্যাপারীহাট গোসাইবাড়ি শিবমন্দিরটি কয়েক যুগ থেকে মন্দিরের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য মন্দিরের নামে জমিজমা থাকা সত্বেও পরিত্যক্ত অবস্থায় দিন দিন ধ্বংসের পথে যাওয়ায় নাগেশ্বরীর প্রাচীন গোসাই বাড়ীর শিবমন্দিরটির সংরক্ষণের জন্য নাগেশ্বরী উপজেলা সনাতনী পরিষদের উদ্যোগে গত ২৪ এপ্রিল গোসাইবাড়ী শিবমন্দিরে অষ্ট প্রহর মহানাম যজ্ঞের আয়োজন করে। প্রাচীণ গোসাইবাড়ি শিবমন্দির প্রাঙ্গন পরিষ্কার করতে উপজেলা সনাতনী পরিষদের কয়েকজন সদস্য ও শিক্ষার্থীরা গেলে মন্দিরের সেবায়েত দাবীকারী প্রয়াত স্বপন কুমার চ্যাটার্জির কন্যা শ্রী মতি শুকলা চ্যাটার্জি ও তার স্ত্রী শ্রী মতি তাপসী চ্যাটার্জি মন্দিরে পুজার কাজে বাঁধা সৃষ্টি করে ব্যানার ছিড়ে ফেলার চেষ্টা করেন এবং পুজার আয়োকজকসহ ঘটনাস্থলে আসা কয়েকজন সাংবাদিককেও অশ্লীলভাষায় গালিগালাজ এবং গাঁজাখোর বলে আখ্যা দিয়ে শুকলা চ্যাটার্জির নামে ভ্যারফাইড ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়। শুকলা চ্যাটার্জির পরিবারের পক্ষ থেকে দাবী করা হয় গোসাই বাড়ী শিবমন্দিরের সেবাইয়েত ছিলেন প্রয়াত স্বপন কুমার চ্যাটার্জি (মাষ্টার)।তার মৃত্যুর পরে সেই সুত্র ধরেই তার স্ত্রী শ্রীমতি তাপসী চ্যাটার্জি এ মন্দিরের সেবায়েতের দায়িত্ব লাভ করেন। কিন্তু স্বপন কুমার চ্যাটার্জি মন্দিরের সেবায়েত হিসাবে দাবী করলেও কাগজে কলমে স্বপন কুমার চ্যাটার্জির কোন বৈধ কোন নিয়োগ পত্র না থাকার পরেও স্বঘোষিত সেবায়েত দাবী করে দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে মন্দিরের জায়গা দখলে রেখেছেন এবং কিছু কিছু জমি টাকার বিনিময়ে লিজ দিয়েছেন । শুধু তাই নয় মন্দির প্রাঙ্গণে বড় বড় গাছ বিক্রি করে টাকা নিজেই ব্যক্তিগত কাজে খরচ এবং বিভিন্ন সময়ে মন্দিরের জন্য সরকার থেকে আসা অনুদানের টাকা আত্মসাৎ করায় দীর্ঘ যুগের পর যুগ পরেও মন্দিরে উন্নয়নের ছোয়া লাগেনি। নাগেশ্বরী উপজেলা সনাতনী পরিষদের উদ্যোগে প্রাচীণ গোসাইবাড়ি শিবমন্দিরটি রক্ষায় এবং নিয়মিত পুজার্চনা চালু করার ঘোষনায় টনক পরে প্রয়াত সেবায়েত স্বপন কুমার চ্যাটার্জির স্ত্রী ও কন্যা শুকলা চ্যাটার্জির। মন্দিরে পুজার কাজে বাঁধা ও ভাংচুর করায় পুরো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।তাছাড়া কোন মন্দিরে মহিলা ব্যক্তি সেবায়েত হতে পারেনা মর্মে অনতি বিলম্বে মন্দিরের সেবায়েত দাবীকারী তাপসী চ্যাটার্জি ও তার কন্যা শুকলা চ্যাটার্জির সনাতন ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে দ্রুত গ্রেফতারসহ সরকারী নিয়মে মন্দির পরিচালনা কমিটি গঠন করে সেবায়েত নিযুক্ত করে প্রাচীন গোসাই বাড়ী শিবমন্দির রক্ষায় প্রশাসনসহ সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এগিয়ে আসার আহবান করেছেন।
