শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রজনী মুসলিম উম্মাহর নিকট ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত। ‘বরাত’ শব্দের অর্থ মুক্তি বা নিষ্কৃতি। এ রাতকে গুনাহ থেকে মুক্তি, আল্লাহর রহমত লাভ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য আত্মশুদ্ধির এক মহামূল্যবান সুযোগ হিসেবে গণ্য করা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজে এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগি ও আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে।
পবিত্র কোরআনে ‘শবে বরাত’ নামটি সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও সূরা আদ-দুখানের আয়াতে একটি ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাতের কথা এসেছে—

“নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি ছিলাম সতর্ককারী। সে রাতে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।”
— (সূরা আদ-দুখান: ৩–৪)

অনেক মুফাসসিরের মতে, এই বরকতময় রাতের সঙ্গে শবে বরাতের গভীর তাৎপর্য রয়েছে। এ রাতে আগামী এক বছরের রিজিক, জীবন-মৃত্যু ও বিভিন্ন বিষয় আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত হিকমতের আলোকে লিপিবদ্ধ হয়। তবে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমতও বিদ্যমান, যা ইসলামের বৌদ্ধিক ভারসাম্য ও গবেষণার পরিচায়ক।

হাদিস শরিফে শা‘বান মাসের মধ্যরাত্রির বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন—

“আল্লাহ তায়ালা শা‘বান মাসের মধ্যরাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বনু কালব গোত্রের ভেড়ার লোমের সংখ্যার চেয়েও বেশি মানুষকে ক্ষমা করে দেন।”
— (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

আরেক হাদিসে এসেছে, এ রাতে শিরককারী, বিদ্বেষ পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং হিংসাপরায়ণ ব্যক্তিরা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। এর মাধ্যমে ইসলাম পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্পর্ক রক্ষা ও অন্তরের পবিত্রতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

শবে বরাত উপলক্ষে রাসূলুল্লাহ (সা.) নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ আমল ফরজ বা ওয়াজিব হিসেবে নির্ধারণ করেননি। তবে সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনগণ এ রাতে নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও তওবায় আত্মনিয়োগ করতেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়।

এই রাতে করণীয় আমলসমূহের মধ্যে রয়েছে—
নফল নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, বেশি বেশি ইস্তিগফার, দরুদ পাঠ এবং নিজের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠভাবে ক্ষমা প্রার্থনা।

ইসলামি শরিয়তে শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অতিরঞ্জিত আচরণ, নির্দিষ্ট সংখ্যক নামাজকে বাধ্যতামূলক করা, আতশবাজি, উচ্চ শব্দে আনন্দ-উল্লাস কিংবা কবরকে কেন্দ্র করে অনৈসলামিক রীতিনীতি সমর্থিত নয়। আলেমদের মতে, ইবাদত হতে হবে নিরবে, বিনয়ের সঙ্গে এবং সুন্নাহসম্মত পন্থায়।
শবে বরাত মানুষকে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির পথে আহ্বান জানায়। এ রাত স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ ভুল করে, গুনাহে লিপ্ত হয়; কিন্তু আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। খাঁটি তওবা ও সংশোধনের দৃঢ় অঙ্গীকারের মাধ্যমে একজন মানুষ নতুনভাবে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।

এ পবিত্র রজনীতে আসুন, আমরা অতীতের ভুল থেকে ফিরে এসে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করি, পারস্পরিক বিদ্বেষ পরিহার করি এবং নৈতিক ও মানবিক জীবনের পথে নিজেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো পড়ুন