মনজুরুল ইসলাম

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের মত প্রকাশের সবচেয়ে সহজ এবং শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। এখানে যে কেউ নিজের মতামত জানাতে পারে, তথ্য শেয়ার করতে পারে, কিংবা অন্যের বক্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কিন্তু এই স্বাধীনতার মাঝেই ধীরে ধীরে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে—শিক্ষিতদের একাংশ অযাচিতভাবে অশিক্ষিত বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে সমর্থন করায় পুরো পরিবেশ কলুষিত হয়ে উঠছে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—“অশিক্ষিত” বলতে এখানে কোনো মানুষের ব্যক্তিগত মর্যাদা নয়, বরং তথ্য-ভিত্তিক জ্ঞান, যুক্তি ও দায়িত্বশীলতার অভাবকে বোঝানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সময় দেখা যায়, যাচাইবাছাই ছাড়া ভুল তথ্য, গুজব বা উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, এসব পোস্টে অনেক শিক্ষিত মানুষও না বুঝে বা কখনো সচেতনভাবেই সমর্থন দিয়ে থাকেন।
এই সমর্থন কেন বিপজ্জনক? কারণ, শিক্ষিত মানুষের বক্তব্য বা সমর্থন সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফলে ভুল তথ্য আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা অনেক সময় সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এতে করে সমাজে বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ ও ভুল ধারণা তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
অনেকে যুক্তি দেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার আছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মৌলিক অধিকার। তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও জড়িত। যে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা, যুক্তির ভিত্তিতে মতামত দেওয়া এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা—এগুলোই একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশের পূর্বশর্ত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন শুধু ব্যক্তিগত মত প্রকাশের জায়গা নয়; এটি জনমত গঠনের একটি বড় ক্ষেত্র। এখানে একটি ভুল তথ্য বা অযৌক্তিক বক্তব্য যদি শিক্ষিতদের সমর্থন পায়, তাহলে তা দ্রুতই “জনমত” হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে, যা বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত ও আচরণেও প্রভাব ফেলে।
তাই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। শিক্ষিত সমাজের উচিত নিজেদের ভূমিকা নতুন করে ভাবা। শুধু ডিগ্রি থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং সঠিক তথ্য প্রচার, যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং বিভ্রান্তি প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখাই প্রকৃত শিক্ষিত হওয়ার পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কলুষমুক্ত রাখতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষিতদের উচিত হবে অন্ধ সমর্থন না দিয়ে, সত্য ও যুক্তির পক্ষে দাঁড়ানো। কারণ, একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মান অনেকটাই নির্ভর করে তার শিক্ষিত অংশের আচরণের ওপর।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন আমাদের সুযোগ দিয়েছে, তেমনি দায়িত্বও বাড়িয়েছে। এই দায়িত্ব যদি আমরা সঠিকভাবে পালন না করি, তাহলে প্রযুক্তির এই আশীর্বাদই হয়ে উঠতে পারে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ।
লেখক: সাংবাদিক, মহাকাল গবেষক, প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *